খুলনা থেকে ফিরে: স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রাইম অব দ্য এনসিয়েন্ট মেরিনার’-এর কালজয়ী পংক্তি—‘ওয়াটার, ওয়াটার, এভরি হয়্যার, নর এনি ড্রপ টু ড্রিংক’। চারদিকে শুধু পানি, কিন্তু খাওয়ার মতো এক ফোঁটাও নেই। এই পংক্তির নির্মম বাস্তব রূপ দেখা যায় সুন্দরবন-ঘেঁষা খুলনার দাকোপ উপজেলায়।
এই জনপদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে নদী আর নদী। অথচ খাবার পানি জোগাড় করাই এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় চিন্তা। প্রতিদিন একটু পানির জন্য মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে পুকুর বা ডোবার ময়লা পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দাকোপের এই সংকটের মূলে রয়েছে এর ভৌগোলিক গঠন। তিনটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই উপজেলার চারপাশের নদীর পানি লবণাক্ত। অন্যদিকে ভূগর্ভে অত্যধিক লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের কারণে বেশিরভাগ নলকূপই অচল। ফলে খরা মৌসুমে একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়নের দুই লাখেরও বেশি মানুষকে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
কেবল গৃহস্থালিই নয়, চা বা খাবারের দোকানের ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের এক গ্লাস খাওয়ার পানি দিতে পারেন না। চালনা বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী হরিনাথ জানান, তিনি মাঝেমধ্যে খরিদ্দারকে পানি পান করাতেই পারেন না। একই কষ্টের কথা জানান দোকানি কামনা বিশ্বাস।
পুকুরের পানি ফিল্টার (পিএসএফ) দিয়ে পানের উপায় থাকলেও পুকুর কমে যাওয়ায় ফিল্টারগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। তাই মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষ সরাসরি পুকুরের পানিই খাচ্ছে। জয়নগর এলাকার শাহিনুর সানার পরিবারকে রোদের মধ্যে ৪-৫ কিলোমিটার হেঁটে পানি আনতে হয়।
পানির এই অভাব কৃষিকাজেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ বছরের মূল ফসল তরমুজ ও ধানে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে গাছ মরে গিয়ে ফলন নষ্ট হচ্ছে। গভীর নলকূপ বসানোর চেষ্টা এখানে কাজে আসেনি। অল্প কিছু অগভীর নলকূপ চালু থাকলেও সেগুলোর পানিতে লবণ, আর্সেনিক ও আয়রন ভরা।
লবণাক্ততার শিকড় যেখানে
মাটির অনেক গভীরেও ভালো পানি না থাকায় এখানে গভীর নলকূপ বসানো যায় না। অগভীর নলকূপের পানিতেও অতিরিক্ত লবণ ও আর্সেনিক। ২০০৯ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে পড়েছিল। দীর্ঘদিন সেই পানি আটকে থাকায় পুরো এলাকার মাটির নিচের পানি নোনা হয়ে যায়। প্রতিবছর ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত এই পানির কষ্ট সবচেয়ে বেশি থাকে।
নেমে গেছে পানির স্তর
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন কুমার রায় জানান, কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপে পানির স্তর ২০ ফুট নিচে নেমে গেছে। আমাদী, বাগালি ও মহারাজপুরে গভীর নলকূপ দিয়েও পানি পাওয়া যায়নি। উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশীতে সামান্য কিছু নলকূপ বসানো গেলেও পানি ওঠে না বললেই চলে। এছাড়া তিলডাঙ্গা, পানখালী, সুতারখালী, কামারখোলা, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানিশান্তা ইউনিয়নে বছরের আট মাসই লেগে থাকে পানির সংকট।
বটিয়াঘাটার উপসহকারী প্রকৌশলী রুনা আক্তার সুমি জানান, সেখানকার তিনটি ইউনিয়নে পানির স্তর ২৫ ফুট নিচে নেমে গেছে।
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, তার এলাকার দেড় লাখ মানুষ খরা মৌসুমে কষ্টে থাকেন। শিবসা নদীর পারের মানুষ বহু বছর ধরে ভুগছেন, আর দেলুটি ও শামুকপোতায় সংকট থাকে সারা বছর।
ভরসা বৃষ্টির পানি
এমন বিপদের মধ্যেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেওয়া ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক’ বা বৃষ্টির পানি জমানোর ড্রাম মানুষের কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। চালনা ইউনিয়নের পারজয়নগরের খাদিজা বেগম বেসরকারি সংস্থা থেকে দুই হাজার লিটারের একটি ট্যাংক পেয়েছেন। আগে তাকে অসুস্থ শরীরে তিন কিলোমিটার হেঁটে পানি আনতে হতো। সংস্থাটি তাকে পানি পরিষ্কার ও ভালো রাখার উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছে।
উপজেলা উপসহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, দাকোপে বর্তমানে ২ হাজার ৬৬৮টি রেইন ওয়াটার ট্যাংক, ২৭টি গভীর নলকূপ ও ৫০০টি অগভীর নলকূপ চালু আছে। তিনি সংকট মেটাতে আরও ট্যাংক দেওয়া ও পুকুর খননের কথা বলেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জানায়, গত পাঁচ বছরে তারা ৫ হাজার ৮২৬টি পানির ট্যাংক দিয়েছে এবং আরও প্রায় দুই হাজার দেওয়ার কাজ চলছে। এনজিওগুলো দিয়েছে প্রায় ১০ হাজার ট্যাংক।
তিন বছর ধরে অচল পানি শোধনাগার
চালনা পৌরসভায় সাত কোটি টাকা খরচ করে বানানো ‘সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ তিন বছর ধরে বন্ধ পড়ে আছে। ডিপিএইচই’র একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৯-২০ সালে এটি তৈরি করা হয়। পৌর ভবনের পাশে এই প্ল্যান্ট বসিয়ে ১২ কিলোমিটার দূরের ভদ্রা নদী থেকে পাইপ দিয়ে ৩৫১টি বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে এটি পৌরসভার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও চালু না করায় এর যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় গ্রাহক সনজিত কুমার জানান, পানির অভাবে তারা চরম কষ্টে আছেন। কিন্তু পানি শোধনাগারের তার ও কলকব্জা চুরি হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, শুকনো মৌসুমে ভদ্রা খাল শুকিয়ে যাওয়ায় পানি আনা যাচ্ছে না। প্ল্যান্টের পাশে পানির জন্য তিন একর জমি বা একটি লেক চাওয়া হলেও পৌরসভা তা দিতে পারেনি।
তবে চালনা পৌরসভার প্রশাসক সনত কুমার বিশ্বাস আশাবাদী। তিনি জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, এগুলো শেষ হলেই পৌরসভার পানির সংকট দূর হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, লেকটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের হওয়ায় কিছু আইনি ঝামেলা আছে, তবে দ্রুত তা সমাধান করে লেক খনন করা হবে।
প্রতিটি ঘরে একটি ট্যাংকের স্বপ্ন
এত সমস্যার মধ্যেও বৃষ্টির পানি জমানোর উদ্যোগ আশা জাগাচ্ছ। সরকারি ও এনজিওর ট্যাংক মিলে বর্তমানে ১০ থেকে ১১ হাজার পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে। প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, সবাই যদি নিয়মিত ট্যাংক পরিষ্কার রাখে এবং ঢেকে পানি ব্যবহার করে, তবে এই জমানো বৃষ্টি দিয়েই সারা বছর চলা সম্ভব।
তবে ট্যাংকের এই সংখ্যা চাহিদার তুলনায় খুব কম। পানখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ ছাব্বির আহমেদ বলেন, এই এলাকার প্রতি পরিবারের জন্য একটি করে ট্যাংক দরকার। অথচ ২০২২ সালের গণনা অনুযায়ী দাকোপে পরিবার আছে প্রায় ৪৩ হাজার।


