হুমায়ূন আহমেদ শুধু বাংলা সাহিত্যের ভাষাই বদলে দেননি, বদলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ভাষাও। গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে তিনি দর্শককে উপহার দিয়েছিলেন সহজ-সরল, যাপিত জীবনের গল্প। অধিকাংশ দর্শক তাকে নাট্যপরিচালক হিসেবে চিনলেও টেলিভিশনে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত নাট্যকার হিসেবে। আর সেই যাত্রার সূচনা হয়েছিল প্রযোজক নওয়াজীশ আলী খানের হাত ধরে। সম্প্রতি এটিএন বাংলার ছোট্ট এক অফিসকক্ষে বসে পেইজ থ্রির সঙ্গে আলাপকালে টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রচারিত নাটক ‘প্রথম প্রহর’-এর নির্মাণসহ নানা স্মৃতি তুলে ধরেন নওয়াজীশ আলী খান।
আশির দশকের শেষের দিকে হুমায়ূন আহমেদ একটি নাটক লিখলেন। যেখানে মহিম নামের একটি চরিত্র ছিল। যে কিনা মেসে থাকত এবং ধুতি পরত। গল্পটা বিটিভির সবার খুব পছন্দ হয়। কিন্তু সমস্যা বাধে অন্য জায়গায়।
কিছুদিন আগে আবদুল্লাহ আল মামুন রবীন্দ্রনাথের গল্প অবলম্বনে একটি নাটক বানান। সেটি দেখে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ক্ষুব্ধ হন এবং ধুতি পরা চরিত্রের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। নওয়াজীশ আলী তাই হুমায়ূনকে চিত্রনাট্য বদলানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হলেও হুমায়ূন আবার নতুন চিত্রনাট্য নিয়ে দেখা করেন। এবার বাধে অন্য বিপত্তি। ‘এলেবেলে’ নামের সেই নাটকের গল্প ছিল একটি জঙ্গলের পাশে থাকা পুকুরে এক রমণীর পাওয়া লাশকে ঘিরে। ‘কিন্তু তখন বিটিভির আউটডোরে গিয়ে শুটিং করার সক্ষমতা খুব একটা ছিল না। তা ছাড়া পুরো জঙ্গলকে লাইটিং করার মতো লাইটও আমাদের ছিল না। ফলে এ গল্পটাও বাদ দিতে হলো,’ বলেন নওয়াজীশ।
শেষ পর্যন্ত এক রাতের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন ‘প্রথম প্রহর’। নওয়াজীশ আলীর ভাষ্যে, ‘তৃতীয় গল্পটি আগেরগুলোর তুলনায় দুর্বল হলেও শেষ পর্যন্ত আমরা সেটিই নির্মাণ করলাম।’
নাটকটির প্রেক্ষাপট মধ্যবিত্ত পরিবার ও তাদের সরকারি চাকরিজীবী সন্তানের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে। এরপর তো হুমায়ূন-নওয়াজীশ জুটি হয়ে গেলেন। তারা দুজন মিলে নির্মাণ করলেন ধারাবাহিক ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’সহ একক নাটক ‘নিমফুল’, ‘গাছ মানুষ’, ‘জননী’সহ শতাধিক নাটক।
‘বহুব্রীহি’ নাটকের বিখ্যাত সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ নিয়েও জানালেন নওয়াজীশ। ‘তখন চাইলেই রাজাকার শব্দটা ব্যবহার করা যেত না। তখন হুমায়ূনসহ আমরা সবাই মিলে চিন্তা করলাম, মুখে রাজাকার বললে তো অসুবিধা। তাহলে কী করা যায়? তখন রূপকভাবে কিছু করার চিন্তা থেকেই পাখির মুখে সংলাপটি দেওয়ানো হয়। এতে করে আমাদের বিপদে পড়ার ঝুঁকি কমে যায়,’ বলেন নওয়াজীশ। এ ব্যাপারে তাদের দুজনকে সহায়তা ও সাহস জুগিয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তি মুস্তাফা মনোয়ার।
হুমায়ূন আহমেদ চেয়েছিলেন তার সব নাটক প্রযোজনা করুক নওয়াজীশ আলী খান। কিন্তু তিনি তাকে পরিচয় করিয়ে দেন আরেক বিখ্যাত প্রযোজক মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। এরপর তো বরকতউল্লাহও হুমায়ূনের গল্প-চিত্রনাট্যে নাটক নির্মাণ করেছেন।
তাদের দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক। প্রতি সপ্তাহেই হুমায়ূনের বাড়িতে তাদের আড্ডা হতো। কিন্তু হুমায়ূনের দ্বিতীয় বিয়ের পর পারিবারিক কারণে সেই আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তাদের মধ্যকার পেশাদার শ্রদ্ধা সবসময় বজায় ছিল বলে জানান নওয়াজীশ।
নওয়াজীশ আলী খানের মতে, হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এমন একজন স্রষ্টা, যিনি সাধারণ ঘটনার মধ্য দিয়ে অসাধারণ বার্তা দিতে পারতেন। তার মতে, একজন সফল প্রযোজকের মধ্যে কিছুটা ‘পাগলামি’ থাকা দরকার, যা তিনি হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে বারবার অনুভব করেছেন।


