সাত বছরের শিশু বাসিত খান মুসা যখন হাসে আর খেলাধুলা করে, তখনই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান তার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান। বুকের গভীর থেকে উঠে আসে এক হাহাকার।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। মুসার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। নানি মায়া ইসলামের সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে রাজধানীর রামপুরার মেরাদিয়া হাট এলাকায় নিজেদের ভবনের নিচতলায় নেমেছিল সে। তখনই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা।
সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ চলছিল। আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। গোলাগুলির মধ্যে পড়ে মুসা ও তার নানি। একটি গুলি মুসার কপাল ছুঁয়ে মাথার এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে তার নানির পেটে বিদ্ধ হয়। পরদিন মারা যান নানি। মুসা বেঁচে গেলেও তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
অন্যের সাহায্য ছাড়া মুসা হাঁটতে পারে না। একা উঠে বসতেও পারে না। প্রতিদিন সকালে তাকে বিছানায় বসিয়ে রাখা হয়। বিকালে সোফায় বসানো হয়। এই দুই জায়গাতেই কাটে তার পুরো দিন।
মুসার ডান হাত, ডান পা ও মুখের ডান পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। মুখ দিয়ে শুধু জুস খেতে পারে। অন্য সব খাবার নাকে লাগানো টিউবের মাধ্যমে দিতে হয়। এরপরও মুসা হাসে, খেলাধুলা করে। সন্তানের সেই হাসি দেখে বারবার ভেঙে পড়েন তার বাবা।
চিকিৎসার পর নীরবতা
মুসাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সরকার তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে তার মাথা, ঘাড় ও পেটে ২০টির বেশি অস্ত্রোপচার করা হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, গুলির একটি অংশ এখনো তার শরীরের ডান পাশে আটকে আছে। সেটি বের করা সম্ভব নয়।
সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসার পর ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল দেশে ফেরে মুসা। একই বছরের ডিসেম্বরে আবার সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে আর যেতে পারেনি।
মোস্তাফিজুর রহমান বারবার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোনো সাড়া পাননি। পরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করে জানায়, মুসা সিঙ্গাপুরে যেতে পারবে।
তবু পরিবারের দুশ্চিন্তা কাটেনি। মোস্তাফিজুর বলেন, ‘তার ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। ওষুধ ছাড়া সে কতদিন ভালো থাকবে, তা কেউ বলতে পারছে না। সরকার যদি চিকিৎসা দিতে না পারে, তবে তা স্পষ্ট করে বলুক। আমরা আবার রাজপথে নামব। আমরা ওর মাকে হারিয়েছি। এখন যদি আমার ছেলের কিছু হয়, তবে আমার বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ থাকবে না।’
হাজার হাজার আহত
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩৭০ জন। তাদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা, পরবর্তী পরিচর্যা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আহতদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিল। বিদেশে চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, কল্যাণ ট্রাস্ট ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিও ছিল। দুই বছর পর প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে।
জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের গণসংযোগ কর্মকর্তা শহীদ অভিযোগ করেন, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে প্রভাব ও যোগাযোগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে চিকিৎসা সম্ভব এমন অনেকেই বিদেশে গেছেন। অথচ যাদের সত্যিই প্রয়োজন ছিল, তারা বাদ পড়েছেন।
এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন মিরপুরের মিথুন ইসলাম। ২৬ জুলাই তার ডান চোখে গুলি লাগে। এতে স্থায়ী ক্ষতি হয়। শুরুতে নিজের খরচে চিকিৎসা করান। পরে সরকার থেকে এককালীন অনুদান পেলেও তা ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না।
মিথুন বলেন, ‘পাঁচটি গুলির মধ্যে চারটি বের করা হয়েছে। আমি এখনো ডান চোখে ভালো দেখতে পাই না। একটি গুলি এখনো আমার মাথার ভেতরে আটকে আছে।’
প্রাথমিকভাবে গেজেটে তার নাম ‘সি’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে একটি মেডিকেল টিমের সুপারিশে তাকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো সেবাই পাননি। তার মতে, উদ্যোগগুলো কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ হয়নি।
আহত হওয়ার আগে মিথুন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এখন সেই চাকরি নেই। তিনি বলেন, আগের মতো চাপ সামলাতে না পারায় কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে চাকরি দিতে চায় না।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি। কিন্তু নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আমরাই তা ধ্বংস করছি। শুধু সরকারের পতন হয়েছে। আর কিছুরই পরিবর্তন হয়নি।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক সরকারি হাসপাতাল এখন আহতদের প্রতি অবহেলা করছে। রুটিন চেকআপ বা কাগজপত্রের কাজ করতে গিয়ে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরতে হয়। এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আহতদের ক্ষোভ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তারা অন্তত তিনবার রাজপথে নেমেছেন।
২০২৪ সালের ১৩ ও ১৪ নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি আহতরা বিক্ষোভ করেন। সরকার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু রাখা হয়েছে।
আহতদের নিয়মিত পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে জুলাই অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কোনো জবাব দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যস্ত আছি। অবসর পেলে আপনাকে ফোন করব।’
পরে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর কোনো উত্তর দেননি।
একই অধিদপ্তরের সহকারী সচিব মোসাম্মৎ সুলতানা আক্তার ও মো. বিল্লাল হোসেনও এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
আহতদের দুর্দশার বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক জার্নালেও উঠে এসেছে। ‘কিউরিয়াস’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণার শিরোনাম ‘মেন্টাল হেলথ কনসিকুয়েনসেস অব দ্য জুলাই আপরাইজিং ইন বাংলাদেশ: এ স্টাডি অন ডিপ্রেশন অ্যান্ড পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার অ্যামং ভিকটিমস অব ভায়োলেন্স অ্যান্ড পারসিকিউশন’।
গবেষণায় দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত তরুণদের ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) এবং ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ বিষণ্নতায় (ডিপ্রেশনে) ভুগছেন।
গবেষণায় রুয়ান্ডা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, জুলাইয়ে আহতদের মধ্যে বিষণ্নতার হার প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি। পিটিএসডির হারও প্রায় দেড় গুণ বেশি।
গবেষকদের মতে, প্রাণঘাতী হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া, স্থায়ী শারীরিক পঙ্গুত্ব, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার চাপ, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা এবং এমন সহিংসতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকা আহতদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তবে গবেষণার পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা। মিথুন ইসলামের ভাষায়, ‘একশর মধ্যে ১০ জনও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পান না।’


