গাজী টায়ারস ট্র্যাজেডি: ১৮২ নিখোঁজ প্রাণ কি শুধুই সংখ্যা?

গাজী টায়ারস ট্র্যাজেডি: ১৮২ নিখোঁজ প্রাণ কি শুধুই সংখ্যা?
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসীতে গাজী টায়ারস কারখানার আগুনে পোড়া ছয়তলা ভবনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে। ভবনের ছাদ ধসে পড়েছে। দেয়ালে আগুনের দাগ। স্থানীয়দের ধারণা, ভেতরে এখনও মানুষের হাড়গোড় রয়ে গেছে।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ ১৮২ পরিবারের অপেক্ষার শেষ হয়নি। তারা প্রিয়জনের কোনো চিহ্ন পাননি। তাদের খুঁজে বের করার কাজেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন কারখানায় ব্যাপক লুটপাট হয়। পরে সেখানে আগুন লাগানো হয়।

সরকার ১৮২ জন নিখোঁজের তালিকা করলেও পরিবারগুলো এখনও শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ঘটনার তদন্তে গঠিত সরকারি কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত ভেঙে ফেলা, উদ্ধার হওয়া হাড়গোড়ের ডিএনএ পরীক্ষা এবং পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু আজও একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।

শত শত কোটি টাকার কারখানা ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ২০০ মানুষ এক রাতে নিখোঁজ হয়েছে। এত বড় ট্র্যাজেডি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। প্রশাসনের অবহেলায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির টাইমস অব বাংলাদেশ-কে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার বিস্তারিত জানা নেই। পরে তিনি জানান, খোঁজাখুঁজির সুবিধার জন্য কারখানার জায়গা পরিষ্কার করতে মালিককে বলা হয়েছে।

পুলিশ সুপার জিমানুর রহমান মুন্সী এ বিষয়ে মন্তব্য না করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদীর কাছে পাঠান। তিনি জানান, ১৮২ জন নিখোঁজের কারও খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী টাইমস-কে বলেন, ‘আমরা নিখোঁজদের মোবাইলের লোকেশন ও সিগন্যাল ট্র্যাক করছি। তদন্ত প্রায় শেষ। খুব তাড়াতাড়ি প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
যে রাতে আগুনে পুড়েছিল কারখানা

আরও পড়ুন

এই ঘটনার শুরু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। লুটপাটের পর গাজী টায়ারস কারখানায় আগুন লাগানো হলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ২৫ আগস্ট গোলাম দস্তগীর গাজীর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে শত শত মানুষ কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্বৃত্তরা ছয়তলা ভবনের নিচতলায় আগুন লাগিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। ফলে ভেতরে থাকা মানুষ আটকা পড়েন। কারখানার কেমিক্যাল ও কাঁচামালের কারণে আগুন টানা পাঁচ দিন জ্বলেছিল।

আগুন ও ধোঁয়া কমলে স্বজনরা ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। নিখোঁজের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেলে ফায়ার সার্ভিস গণনা বন্ধ করে দেয়। পরে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ১৮২ জন নিখোঁজের চূড়ান্ত তালিকা করা হয়। ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকির কথা জানিয়ে উদ্ধার অভিযানও বন্ধ করে দেওয়া হয়।ম উপায় না পেয়ে স্বজনরা নিজেরাই পোড়া ভবনে ঢোকেন। তারা হাড়গোড় উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার আশায় পুলিশের কাছে জমা দেন। কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হয়নি
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের গঠিত আট সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ঘটনাকে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ বলা হলেও কোনো অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

কমিটি ১০টি সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ভেঙে তল্লাশি চালানো, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দেহাবশেষ পরিবারের কাছে হস্তান্তর।

এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন করে তল্লাশি চালানো হয়নি। স্বজনরা এখনও প্রিয়জনের দেহাবশেষ পাননি। ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়েও প্রশাসনের কোনো অগ্রগতি নেই।

স্বজনদের অপেক্ষা ফুরোয়নি
গত ৮ জুলাই নিখোঁজদের স্বজনরা স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর বাড়ির সামনে জড়ো হন। তারা অন্তত স্বজনদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান, যাতে শেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন।

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন দুই ভাই সাব্বির ও শাহাদাত সিকদার এবং তাদের ভগ্নিপতি জমীর আলী। তাদের বোন সিনথিয়া জানান, পরিবারের উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে হারিয়ে তারা চরম কষ্টে আছেন। তিনি একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। অসুস্থ ভাগ্নের চিকিৎসার জন্য ছুটি নেওয়ায় সেই চাকরিও হারান।

সিনথিয়া টাইমস-কে বলেন, ‘পুলিশ আর ডিসি-এসপি অফিসে ঘুরতে ঘুরতে আমরা হয়রান। পুলিশ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মনে হয় আমরা মানুষই না। ডিসি অফিসে আমাদের দরজার কাছ থেকেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আমরা একটি সঠিক উদ্ধার অভিযান চাই। আমাদের স্বজনরা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, এটুকু জানার অধিকার কি আমাদের নেই?’

লুটপাটের খবর পেয়ে কারখানায় গিয়ে নিখোঁজ হন মনির। তাকে খুঁজতে সুনামগঞ্জ থেকে আসেন তার বড় ভাই জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনকে কিছু করতে না দেখে আমি নিজেই পোড়া কারখানার ভেতরে ঢুকি। আমরা অনেক হাড়গোড় উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন সব কিছু চেপে রেখেছে।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, ‘যদি কেউ এসে হাড়গুলোর দাবি করত, তবে আমরা ডিএনএ পরীক্ষা করাতাম। কেউ দাবি করেনি। তাই পরীক্ষা করা হয়নি।’

দুই বছর আগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে আছেন কারখানার মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী। মন্তব্যের জন্য গাজী গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad