গুলি, নিখোঁজ ও বিস্মৃতি: হৃদয়ের না-বলা গল্প

গুলি, নিখোঁজ ও বিস্মৃতি: হৃদয়ের না-বলা গল্প
জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি। ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

ঘটনাটি দুই বছর আগের। ৫ আগস্ট বিকালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে যখন সারা দেশ উল্লাসে ফেটে পড়ে, ঠিক তখনই গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানার কাছে গুলিবিদ্ধ হন ২১ বছর বয়সী ছাত্র মো. হৃদয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ ও কয়েকজন লোক মিলে তার নিথর দেহ চাদরে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। দুই বছর কেটে গেলেও পরিবার এখনো জানে না তাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে, নাকি লাশ কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনে শহীদদের তালিকায় আজও জায়গা পায়নি এই তরুণের নাম।

সেই রক্তঝরা দিনে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে হৃদয়ের এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি অজানা এক অধ্যায় হয়েই রয়ে গেছে। দেশজুড়ে প্রাণ হারানো অসংখ্য মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেছে হৃদয়।

হৃদয়ের দাদি ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ওর পথ চেয়ে বসে আছি। হৃদয় ছিল আমাদের ঘরের আলো।’

তার বাবা লাল মিয়া আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘ছেলেটার লাশের একটা টুকরোও যদি কোথাও পেতাম, তাহলেও হয়তো আত্মাটা একটু শান্তি পেত।’

সেদিন সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অনেকেই প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন আন্দোলনকারী, কেউ পুলিশ, কেউ ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতা বা স্বজন, আবার কেউ অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে নিজেই দগ্ধ হয়ে মারা যান।

ওই দিন বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ছেড়ে দিল্লি চলে যান। একই দিনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা দেন, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলবেন।

চারপাশের এমন চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ঘটে হৃদয়ের মর্মান্তিক ঘটনা। পরে তার পরিবার একটি মামলা করে। গত দুই বছরে এই মামলার চারজন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। কিন্তু অপরাধীদের আজও শনাক্ত করা যায়নি।

একটি নিরন্তর সংগ্রাম

হৃদয় ছিলেন টাঙ্গাইলের হেমনগর ডিগ্রি কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। সংসারের টানাপোড়েনে খুব ছোট বয়সেই তাকে রোজগারে নামতে হয়। তার বাবা মো. লাল মিয়া পেশায় একজন ভ্যানচালক। তিনি কষ্ট করে ছেলেকে একটি রিকশা কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু রিকশা চালানো শুরু করার মাত্র তিন দিনের মাথায় গুলিবিদ্ধ হন হৃদয়।

আরও পড়ুন

লাল মিয়া জানান, রিকশা চালিয়ে হৃদয় দিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় করতেন। তিনি গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় তার খালাতো ভাই মো. ইব্রাহিমের সঙ্গে থাকতেন, যিনি নিজেও একটি অটো-রিকশা চালাতেন।

হৃদয়ের বড় বোন ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘আমার ভাইটা খুব হাসিখুশি ছিল, সব সময় ঝামেলা এড়িয়ে চলত। কেউ বকা দিলেও সে শুধু মৃদু হাসত।’

সেদিন যা ঘটেছিল

৫ আগস্ট সকালে হৃদয় তার বাবাকে ফোন করে ৩ হাজার টাকা চান। চারপাশের খারাপ পরিস্থিতি দেখে তিনি টাঙ্গাইলের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালাতো ভাই ইব্রাহিম তাকে গাজীপুরে থেকে রিকশা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

সকাল ৯টার দিকে দুই ভাই তপন আলীর গ্যারেজে যান। সেখানে হৃদয়ের বাড়ি ফেরা নিয়ে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। মন খারাপ করে হৃদয় ঘরে ফিরে কাঠের চৌকিতে শুয়ে বিশ্রাম নেন। দুপুরে দুই ভাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে আবারও বিশ্রাম নেন।

বিকালের দিকে সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ কোনাবাড়ীতে আনন্দ মিছিলে যোগ দেয়। ইব্রাহিম আগেই বের হয়েছিলেন, পরে দেখেন হৃদয়ও সেই মিছিলে যোগ দিয়েছেন।

বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে থানার কাছে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হৃদয়ের বোন ইয়াসমিন তাকে ফোন করেন। বোন সতর্ক করে বলেন, ‘টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করা হচ্ছে, তুই সাবধানে থাকিস।’

হৃদয় তখন বলেন, ‘আপু, এখানেও প্রচুর গোলাগুলি হচ্ছে। তুমি সাবধানে থেকো। রাতে কথা হবে।’

ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তেজিত জনতা কোনাবাড়ী থানায় হামলা চালায়। পুলিশও পাল্টা টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। এই দৌড়াদৌড়ির মধ্যে হৃদয় তার ভাইয়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। তিনি একটি গ্যারেজে লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শরীফ মেডিকেলের সামনে পুলিশ তাকে ধরে ফেলে।

শরীফ মেডিকেলের কর্মী কানিজ ফাতেমা নিশি জানান, ‘পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে পেছন থেকে গুলি করে।’

ইব্রাহিম বলেন, ‘আমার ওর কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি। ভেবেছিলাম আমাকেও মেরে ফেলবে। পরে দেখলাম ওর নিথর দেহটা থানার সামনে পড়ে আছে।’

এনসিপির ছাত্রনেতা ময়দুল ইসলাম জানান, আবেদ আলী নামে পুলিশের এক ইনফর্মার আলামত ধ্বংস করতে সাহায্য করেছিলেন। ফলে তাকেও মামলায় আসামি করা হয়।

পরে রিমান্ডে জানা যায়, কোনাবাড়ী থানার পুলিশ কর্মকর্তা মুন্সী নীল রতনও প্রমাণ মুছে ফেলার কাজে জড়িত ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ চাওয়া হলেও তা দেওয়া হয়নি, পুলিশের দাবি ক্যামেরা নষ্ট ছিল।

ভাইরাল ভিডিওতে যে তরুণকে হৃদয়ের মরদেহ বহন করতে দেখা যায়, পরে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার নাম মাহমুদুল হাসান আলিম, যিনি তখন ছিলেন আইইউবিএটি-এর প্রথম বর্ষের ছাত্র। জামিন নিয়ে বর্তমানে অষ্ট্রিয়ায় আছেন আলিম।

আলিমের চাচা শাহীন বলেন, ‘আলিম আমাদের জানিয়েছিল, সে যখন প্রথম হৃদয়কে ছুঁয়েছিল, তখন হৃদয়ের শরীরে প্রাণ ছিল।’

তবে আলামত নষ্ট করার অভিযোগ অস্বীকার করে আবেদ আলী বলেন, ‘পুলিশই লাশ নিয়ে গেছে। আমি শুধু আমার দোকানপাট ও মার্কেট বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad