দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা বাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় হাজারেরও বেশি কিশোরকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আটক বা গ্রেপ্তার করে এই অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণগুলো সমাধান না করলে এই সমস্যা থেকেই যাবে।
অনেক কিশোরকে আটক করা হলেও আইনের কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা যাচ্ছে না। ১৮ বছরের কম বয়সীদের সাধারণ জেলে রাখার নিয়ম নেই। অন্যদিকে, দেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে জায়গার চেয়ে বেশি কিশোর থাকায় সেখানে এমনিতেই ভিড় লেগে আছে।
তাই আগের অভিযানগুলোর মতোই, এবারও মুচলেকা নিয়ে অনেক কিশোরকে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে যারা কলকাঠি নাড়ে ও টাকা জোগায়, তাদের ধরতে না পারাটাই বড় সমস্যা। অপরাধে জড়িত কিশোরদের মূলত ব্যবহার করে বয়সে বড় অপরাধী, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তিরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’, পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতাদের পাশাপাশি জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও বিচারে আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আইনের পাশাপাশি পরিবার, স্কুল-কলেজ, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।’
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম নামের ১৩ বছরের এক শিক্ষার্থী কিশোর অপরাধীদের হাতে খুন হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকেই কিশোর অপরাধ দমনে নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজাতে শুরু করে পুলিশ। এই বিষয়গুলো তদারক করতে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা হয়েছে।
পুলিশ এখন কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা নতুন করে তৈরি করছে এবং বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালাচ্ছে।
কুমিল্লায় চার দিনে ১ হাজার ৬৭২ জনকে আটক করা হলেও পরে ১ হাজার ৩০০ জনকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। চাঁদপুরের আটটি উপজেলায় ৩৭০ জনকে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫৫ জনই মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। লক্ষ্মীপুরে ২৬৬ জনকে আটক করে ২১৪ জনকে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে নোয়াখালীতে আটক হওয়া ১৬০ জন কিশোরের সবাইকেই পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন টাইমসকে জানান, যাদের নামে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তাদের প্রথমবার সতর্ক করে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
সারাদেশে শত শত কিশোর গ্যাং
রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এদের বেশিরভাগ সদস্যের বয়সই ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি গ্যাং সক্রিয় আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় অপরাধী ও রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এসব গ্রুপ গড়ে ওঠে।
এই সমস্যা এখন আর শুধু ঢাকায় আটকে নেই; জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে।
কিশোরগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা উজ্জ্বল সরকার কিশোর গ্যাংদের উপদ্রব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে টাইমসকে বলেন, ‘একজন ডাক দিলে সবাই একসাথে চলে আসে। এলাকার মুরুব্বিদের কোনো তোয়াক্কাই করে না। এদের জ্বালাতন ও উৎপাতে সবাই অতিষ্ঠ।’
যেখানে পুলিশের উপস্থিতি বেশি, সেই ঢাকাতেও কিশোর অপরাধীরা চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন, হামলা ও জমি দখলের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় এক দল অপরাধী সেলুনে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় এবং এক যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। তদন্তে ‘আরমান-শাহরুখ’ গ্যাংয়ের নাম সামনে আসে। পরে পুলিশ সবুজ হোসেন আরমানকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই মারামারি, চুরি, হত্যাচেষ্টা ও ভয়ভীতি দেখানোর একাধিক মামলা ছিল।
এর আগে ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে ‘অ্যালেক্স গ্রুপ’-এর নেতা ইমন হোসেন ওরফে অ্যালেক্স ইমন প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। সেই ঘটনার সঙ্গেও এই ‘আরমান-শাহরুখ’ গ্রুপের নাম জড়িয়ে ছিল।
সংকটে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র
বাংলাদেশে সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে মাত্র তিনটি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় সেখানে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩০০ জনের জায়গায় থাকছে প্রায় ৭০০ জন। যশোরের পুলেরহাট কেন্দ্রে ১৫০ জনের জায়গায় রয়েছে ৩০০ জনেরও বেশি কিশোর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এদের সঠিক কাউন্সেলিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন বা ব্যক্তিগত যত্ন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তারা সতর্ক করে বলেন, ছোট অপরাধী আর গুরুতর অপরাধীদের একসঙ্গে রাখার ফলে কিশোরদের শুধরে যাওয়ার বদলে আরও বিগড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, জামিনে মুক্তি পেয়ে বা উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে অনেকেই আবার পুরোনো অপরাধে ফিরে যায়। কেউ পুরোনো গ্যাং নতুন নামে চালু করে, আবার কেউ নতুন গ্রুপ খোলে।
তিনি মনে করেন, পারিবারিক পরামর্শ, পড়ালেখা, কাজের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি হলেও সেদিকে তেমন নজর দেওয়া হচ্ছে না।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ফারুক হোসেন এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘পরিবার যদি সন্তানকে ঠিকমতো আগলে রাখে ও নজরদারিতে রাখে, তবে অনেকেই গ্যাং কালচারে জড়াবে না।’
সামাজিক পরিবর্তনের কারণেও এই সংকট বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, জীবিকার প্রয়োজনে মা-বাবার বাইরে থাকা এবং এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে বসবাস করায় সামাজিক বন্ধন ও নজরদারি আগের মতো নেই।
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে ‘বড় ভাইদের’ হাত
অপরাধ বিশ্লেষক ও পুলিশ কর্মকর্তা-উভয়েই স্বীকার করেন, কিশোর গ্যাংয়ের কলকাঠি নাড়ে বয়সে বড় অপরাধী ও প্রভাবশালীরা।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-২-এর (এসআরবি) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নায়মুল হাসান জানান, তারা শুধু কিশোর সদস্যদেরই ধরছেন না, বরং এদের পেছনের মূলহোতাদের চিহ্নিত করতেও কাজ করছেন। তবে তিনি বলেন, সাময়িক পদক্ষেপে দীর্ঘস্থায়ী ফল মিলবে না।
ফারুক হোসেনও বলেন, কিশোর গ্যাং পরিচালনা ও মদদদাতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল গোড়ায় হাত না দিয়ে আগেও এমন অনেক কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি।
তৌহিদুল হক বলেন, কিশোরদের মূলত চাঁদাবাজি, জমি দখল, রাজনৈতিক মারামারি, মাদক ব্যবসা আর ব্যবসায়িক শত্রুতা মেটাতে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘এদের বড় একটা অংশ আসে ভেঙে যাওয়া বা দরিদ্র পরিবার থেকে। অনেকেরই পড়ালেখা বা চাকরি নেই। কাজের সুযোগ না থাকায় তারা সহজেই অপরাধ জগতের পৃষ্ঠপোষকদের ফাঁদে পা দেয়।’


