মরিয়ম ইসলাম বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক। তিনি প্রায়ই একা বিদেশে যাতায়াত করেন। তবে বাংলাদেশে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের আচরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নবাণে তিনি অতিষ্ঠ।
২০১৫ সালে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র যান, তখন ছিলেন অবিবাহিত। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে এক কর্মকর্তা তাকে প্রশ্ন করেন, একা কেন যাচ্ছেন, মা-বাবা কেন সঙ্গে যাচ্ছেন না? এমনকি আমেরিকার ঠিকানাও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা কাগজের টুকরোয় লিখে নেন। ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার যাওয়ার সময় জানতে চাওয়া হয়, ‘স্বামী কোথায়?’ মরিয়ম সেবারও অবিবাহিত জানালে আবার প্রশ্ন আসে, ‘বিয়ে করেননি কেন?’
অবিবাহিত নারীদের বিদেশযাত্রায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নতুন কিছু নয়; বরং এটি প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইমিগ্রেশনে দায়িত্বরতদের এমন প্রশ্নে নারীরা বিরক্ত বা অপমানিত বোধ করলেও কর্মকর্তাদের তাতে কিছু যায়-আসে না।
সম্প্রতি প্রাপ্তবয়স্ক তিন তরুণীর নেপালযাত্রা আটকে দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তবে সেই তরুণীরাও বিষয়টি মেনে নেননি; তারা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চেয়েছে।
বিষয়টি আদালতে গড়ানোর পর ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ সুপার মনিরুজ্জামান এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, মানব পাচার ঠেকানোর চেষ্টার অংশ হিসেবেই ওই তিন তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
তবে ইমিগ্রেশন পুলিশের এই আচরণের পেছনে গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্ব কাজ করছে বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
তিনি বলেন, ‘এই সমাজ নারীবান্ধব নয়। একজন তরুণী রাতে ফিরলেও অন্য একজন নারী নেতিবাচক কথা বলেন। এই সামাজিক মূল্যবোধ ও বদ্ধমূল সেকেলে বিশ্বাস আমাদের সমাজের মধ্যেই রয়ে গেছে।’
সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, যেকোনো নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা তার অন্যতম মৌলিক অধিকার। কিন্তু ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বসা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কৌতূহল, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও আইনি এখতিয়ারবহির্ভূত জিজ্ঞাসাবাদ সেই অধিকারকে প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন করছে।
মরিয়ম বলেন, ‘আমার ইউএস পাসপোর্ট ছিল বলে দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে পারেনি, তবে অনেক ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। আমার মা-বাবার নাগরিকত্ব নিয়েও জেরা করা হয়েছে। প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘আপনি বিয়ে করলে কি আপনার স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে যাবেন?’
তার পরিচিত অন্য নারী যাত্রীদের কাউকে কাউকে আলাদা কক্ষে নিয়ে ‘ফিরে আসবেন কি না’, ‘পালিয়ে যাবেন কি না’, ‘কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না’—এমন নানা অবান্তর প্রশ্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রেও হয়রানির কমতি নেই। আরেক তরুণী তানিয়া আক্তারের পাসপোর্টে তখনও ‘অবিবাহিত’ লেখা ছিল। বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে ভারতে যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কার সঙ্গে যাচ্ছেন?’ স্বামী অন্য টেবিল থেকে ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হয়ে গেছেন জানালেও পুলিশ তা বিশ্বাস করেনি।
তানিয়াকে একাধিক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বিয়ের কাগজপত্র দেখাতে চাইলেও স্বামীকে ভেতরে ডাকতে দেওয়া হয়নি। পরে অন্য এক পুলিশ সদস্য তার স্বামীকে ডেকে আনেন। দুজনের বয়স একই হলেও স্বামীকে দেখতে কিছুটা কমবয়সী মনে হওয়ায় পুলিশ প্রশ্ন তোলে, ‘তিনি কীভাবে আপনার স্বামী হন? একজন শিক্ষার্থীকে কেন বিয়ে করেছেন?’ এমনকি ‘স্বামী তাকে কী খাওয়ান’—এমন ব্যক্তিগত প্রশ্নও করা হয়।
ক্ষুব্ধ তানিয়া বিয়ের কাজী, মা-বাবা ও শাশুড়িকে ডেকে আনতে বললে ইমিগ্রেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তিনি ছাড়া পান। অথচ ভারতীয় ইমিগ্রেশনে তাকে একটি প্রশ্নও করা হয়নি।
অন্যদিকে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর নেপাল যাওয়ার সময় পাসপোর্ট, অফিসের এনওসি, রিটার্ন টিকিট, ইনভাইটেশন লেটার দেখানোর পরও শ্বাসতী দেওয়ান নামের এক যাত্রীকে আধা ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
এক কর্মকর্তা বারবার তার কাছে এনডোর্সমেন্ট দেখতে চান এবং কবে ফিরবেন জানতে চান। ফিরতি টিকিট দেখাতে চাইলেও কর্মকর্তা তা দেখতে চাননি। শ্বাসতীর আক্ষেপ, বিবাহিত হওয়ার কারণেই হয়তো শেষ পর্যন্ত তিনি ভ্রমণের অনুমতি পেয়েছেন। কিন্তু একা নারী ভ্রমণকারী হলেই অতিরিক্ত যাচাইয়ের নামে এমন অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।
তিন তরুণীর আইনি লড়াই
গত ৮ আগস্ট রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি ও নাজনীন—এই তিন বন্ধু মিলে নেপাল ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং যাত্রায় পরিবারেরও পূর্ণ সম্মতি ছিল। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসার এতে আপত্তি জানান। কারণ, তাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ সঙ্গী ছিলেন না এবং তারা কেউই বিবাহিত নন। শেষ পর্যন্ত তাদের বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে তারা আইনি প্রতিকার চান।
তাদের আইনজীবী ইশরাত হাসান টাইমসকে জানান, বোর্ডিং পাস পাওয়ার পর ইমিগ্রেশনে গেলে এই তিন তরুণীকে অযৌক্তিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের বৈবাহিক অবস্থা, খরচের টাকা কোথা থেকে আসছে, পরিবার জানে কি না—এসব প্রশ্ন তোলা হয়। এমনকি সরাসরি তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
ভুক্তভোগী তিন তরুণী গত ৩১ আগস্ট পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার অতিরিক্ত আইজিপির কাছে সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। এক মাস পার হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ৬ সেপ্টেম্বর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। তাতেও সাড়া না পেয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন তারা। রিটে বিবাদী হিসেবে ইমিগ্রেশন পুলিশের ওসির নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রিটের শুনানি শেষে মঙ্গলবার বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়েছে আদালত। একই সঙ্গে আগামী সাত দিনের মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপির কাছে করা অভিযোগটি নিষ্পত্তি করে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ইশরাত বলেন, ‘আদালতের কোনো আদেশ বা ফৌজদারি মামলা ছাড়া পুলিশ কাউকেই বিদেশযাত্রায় বাধা দিতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বৈধ পাসপোর্ট থাকলে পরিবারের সম্মতি আছে কি নেই, তা খতিয়ে দেখার কোনো সুযোগ পুলিশের নেই।’
তিন তরুণীকে এভাবে হয়রানি করার কারণ জানতে চাইলে ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ সুপার মনিরুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের কপি হাতে পেলে আমরা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
ধারাবাহিকভাবে এমন হয়রানির অভিযোগ ওঠার কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘বিষয়টি ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়। নেপালে মানবপাচার চক্র সক্রিয় হওয়ায় তাদের বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে।’
তবে কেবল নেপালগামী তিন তরুণীই নন, বছরের পর বছর ধরে নারীদের ইমিগ্রেশনে এমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই না। আপনারা যে সুনির্দিষ্ট প্রসঙ্গটি টেনেছেন, আমরা সেটাতেই সীমাবদ্ধ থাকি।’
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম মনে করেন, ‘পুলিশের উচিত ছিল প্রাপ্ত উকিল নোটিশের জবাব দেওয়া। তারা চাইলে নিজেদের ভুল স্বীকার করে সংশোধন কিংবা অধীনস্থ কর্মীদের প্রশিক্ষণের কথা জানাতে পারতেন।’
ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রশিক্ষণেও ঘাটতি দেখছেন তিনি। বাহারুল আলম বলেন, ‘ইমিগ্রেশন প্রশিক্ষণে ডাটা এন্ট্রি ও পাসপোর্ট যাচাইয়ের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষের মর্যাদা রক্ষা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে অন্তত দু’একটি সেশন থাকা জরুরি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, ইমিগ্রেশনে এসব হয়রানি মূলত সমাজের গভীর নারীবিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘নারীরা একা বাইরে কেন যাবে—এটাই তাদের মানসিকতা। এখানে নারীকে কতখানি হেনস্থা করা যায়, তা ছাড়া আর কিছুই দেখছি না। এসব বিষয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’


