চেক ডিজঅনার মামলায় কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের সাজা

চেক ডিজঅনার মামলায় কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের সাজা
সাজাপ্রাপ্ত মো। হাসান ইমাম। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী ড. সালাম-জাহানারা ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মো. হাসান ইমাম তালুকদারকে ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাকে সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হয়েছে এবং বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাসান ইমাম তালুকদার কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা।

আদালতের নথি অনুযায়ী, নেত্রকোণার যুগ্ম দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক মিথিলা ফারজানা নীপা গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ এক আদেশে দণ্ডবিধির ১৩৮ ধারায় হাসান ইমাম তালুকদারকে দোষী সাব্যস্ত করেন। চেকের অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় আদালত তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার অর্থ মামলার অভিযোগকারী পাওয়ার অধিকারী বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য হাসান ইমাম তালুকদার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন। ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তারিখের ওই চেকে ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা লেখা ছিল।

পরে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। এরপর একই বছরের ১৮ নভেম্বর তাকে আইনি নোটিশ দেওয়া হলেও পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

মামলার বিচার চলাকালে বাদীপক্ষ একজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে সাক্ষ্য দেয়। তবে আসামি আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গঠিত অভিযোগ পড়ে শোনানো সম্ভব হয়নি। একই কারণে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা যায়নি।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আদনান এগ্রো লিমিটেডের ম্যানেজার (সেলস) মো. সোহেল রানা হাসান ইমাম তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগটি করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই হাসান ইমাম তালুকদার আদনান এগ্রো লিমিটেডের পরিবেশক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ২৪ মে পর্যন্ত বরিশালের ডিপো অফিস থেকে নগদ ও বাকিতে পোল্ট্রি ফিড কেনেন তিনি।

একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে তার ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ১২৪ টাকা বকেয়া হয়। ২০২১ সালের ২৪ মে’র পর তিনি ওই বকেয়া রেখে পোল্ট্রি ফিড নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন

অভিযোগে আরও বলা হয়, পাওনা টাকা চাইলে বিভিন্ন সময় টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি সময়ক্ষেপণ করেন। পরে ২০২২ সালের ২৪ মার্চ বরিশালে আদনান এগ্রো লিমিটেডের অফিসে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পাওনা টাকার হিসাব-নিকাশ করে টাকা ফেরত চাওয়া হলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করে চলে যান।

এরপর ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার সঙ্গে পাওনা টাকার লেজার শিট, ব্যবসায়িক চুক্তিপত্র ও মামলা পরিচালনার অনুমতিপত্রের ফটোকপি দাখিল করা হয়।

হাসান ইমাম তালুকদারের বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনার মামলার পাশাপাশি শিক্ষকতার সঙ্গে সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

তিনি চৌবাড়ী ড. সালাম-জাহানারা ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি দৈনিক জয়সাগর পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে আদনান এগ্রো লিমিটেডের পরিবেশক হিসেবেও তিনি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্য চাকরি বা আর্থিক লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়ে সরকারি নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। এ নিয়ে সিরাজগঞ্জে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করা কয়েকজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ওঠে। তাদের কয়েকজনকে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বিষয়টি নিয়ে সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফুল ইসলাম ইন্না জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

সংশ্লিষ্ট তদন্তে হাসান ইমাম তালুকদারের শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে বলে জানা গেছে। তবে তিনি কোন সময় থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং একই সময়ে সাংবাদিকতা বা অন্য কোনো পেশা থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না-তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়।

চেক ডিজঅনার মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কলেজে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. জোনায়েদ হোসেন।

তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন কলেজে আসেননি। এ কারণে তার বেতনও কর্তন করা হয়েছিল। আবার শুনেছি, তার নামে চেক ডিজঅনারের মামলায় এক বছরের সাজা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মানসম্মানও ক্ষুণ্ন হয়েছে।

কলেজের সভাপতি আজিজ সরকার বলেন, সাজার বিষয় নিয়ে আমরা মিটিংয়ে বসেছিলাম। হাসান ইমাম আমাদের কাছ থেকে সময় নিয়েছেন। সময় পার হওয়ার পর কলেজ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সাজা সম্পর্কে নিজের অবস্থান জানতে চাইলে হাসান ইমাম তালুকদার বলেন, ‘সাজার বিষয়ে আমার জানা নেই। আপনারা কাগজপত্র দেখেন, কী হয়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad