চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা, প্রশ্নের মুখে ‘কোয়াড’

চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা, প্রশ্নের মুখে ‘কোয়াড’
ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নাটকীয় পরিবর্তন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে গঠিত চার দেশীয় কৌশলগত জোট ‘কোয়াড’ বর্তমানে তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত অগ্রাধিকার এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সমঝোতা এই জোটের প্রাসঙ্গিকতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ওয়াশিংটনের অবস্থান পরিবর্তন

২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম গোলার্ধের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’এই পরিবর্তনের মূল কারণ।

এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবহর ও দূরপাল্লার সমরাস্ত্রের একটি বিশাল অংশ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেয়। এক মাসেরও কম সময়ে মার্কিন বাহিনী তাদের যুদ্ধকালীন মজুত থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চার ধরনের যুদ্ধাস্ত্রের অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করে ফেলে।

এর ফলে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে এই ধারণা জোরালো হয়, এই অঞ্চলে কোনো যুদ্ধ বাধলে ওয়াশিংটনকে সামরিক ঢাল হিসেবে পাশে পাওয়া যাবে না।

ট্রাম্প-শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা

সামরিক কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কোয়াড মিত্রদের আরও বেশি চমত্কৃত ও উদ্বিগ্ন করেছে। মে ২০২৬-এ বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-শি জিনপিং শীর্ষ সম্মেলন এবং বড় ধরনের বাণিজ্য চুক্তি এর বড় প্রমাণ। প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম চীন সফর।

এই সফরের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার এক ধরনের তাড়না দেখা গেছে। যদিও বেইজিং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা উদ্বেগ ও কূটনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছে, তবুও এই সমঝোতা কোয়াডের বাকি তিন রাষ্ট্রকে তীব্র ‘পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কায়’ ফেলেছে।

আরও পড়ুন

কোয়াড জোটের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা

কোয়াডের এই স্থবিরতার পেছনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও গাঠনিক দুর্বলতাও কাজ করছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জোটের শীর্ষ স্তরের কোনো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেউই এই ধরনের কোনো সম্মেলনে অংশ নেননি।

কোয়াড কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তি নয়; এর কোনো স্থায়ী সচিবালয় বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নেই।

মূল ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য বাদ দিয়ে জোটটি বর্তমানে ভ্যাকসিন সরবরাহ, সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে, যা এর মূল সামরিক গুরুত্বকে আড়াল করতে পারছে না।

তিন মিত্র দেশের নতুন কৌশল

মার্কিন সামরিক প্রত্যাহারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে টোকিও। কারণ, চীন এই সুযোগে তাইওয়ানের চারপাশে ব্যাপক সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জাপান ২০২৬ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেট ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে, যা তাদের জিডিপির ২ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রাকে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই ছুঁয়ে ফেলেছে।

পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে জাপান এখন অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সামরিক জোট জোরদার করছে।

নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রয়োজনে চীনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক খরচ ভারতের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।

পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সাম্প্রতিক যোগাযোগ এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারত কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না গিয়ে তার পুরোনো ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছে।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে ক্রমাগত শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। এই ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনের নীতি অস্ট্রেলিয়ার নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে যে, বেইজিংয়ের সঙ্গে বড় কোনো দরকষাকষিতে শেষ পর্যন্ত তারা ওয়াশিংটনের ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

বেইজিংয়ের মূল্যায়ন

চীন দীর্ঘকাল ধরে ‘কোয়াড’কে এশিয়ার বুকে ‘এশীয় ন্যাটো’ হিসেবে গড়ে তোলার মার্কিন প্রচেষ্টা বলে নিন্দা জানিয়ে আসছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বেইজিংয়ের কৌশলবিদরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, কোয়াড কোনো সুদূরপ্রসারী অভিন্ন লক্ষ্য বা গভীর অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এটি স্রেফ সাময়িক চীন-ভীতি থেকে তৈরি একটি অসম ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক অবস্থান, যার কার্যকারিতা মার্কিন স্বার্থের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বিলীন হতে শুরু করেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad