পলকেই বন্ধ ইন্টারনেট, ট্রাইব্যুনালে বিটিআরসি কর্মকর্তা

পলকেই বন্ধ ইন্টারনেট, ট্রাইব্যুনালে বিটিআরসি কর্মকর্তা
জুনাইদ আহমেদ পলক। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৫ জুলাই পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি ও ফোরজি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। পরদিন সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর ২৮ জুলাই এক সভায় পলক তৎকালীন জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে চারটি মোবাইল অপারেটরের থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপপরিচালক মাহদী আহমদ।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ প্রসিকিউশনের এই সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, সীমিতকরণ ও পুনরায় চালুর বিষয়ে জবানবন্দী দেন মাহদী আহমদ। ওই সময় তিনি বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ বলেন, ১৪ জুলাই দিবাগত রাত অর্থাৎ ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার পর তার তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন। মহাপরিচালক তাকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন আহম্মেদকে টেলিফোনে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি এবং ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ ও সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মহাপরিচালক মোবাইল অপারেটরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশনা দেন এবং বিষয়টি তাকে ফোনে জানান। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মাহদী আহমদ বলেন, এখানে নেটওয়ার্ক সীমিতকরণ বলতে তিনি থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার কথা বুঝিয়েছেন।

সাক্ষী জানান, ১৫ জুলাই সকাল ৯টার দিকে অফিসে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সকাল ৮টার দিকে যেসব এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সীমিত করা হয়েছিল, সেসব এলাকায় তা আবার চালু করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশনা বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মহাপরিচালক ওই পাঁচটি এলাকায় থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু করেন। নেটওয়ার্ক বন্ধ ও চালুর বিষয়ে পরে নথিতে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

১৬ জুলাই আরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট বন্ধ

মাহদী আহমদ বলেন, ১৬ জুলাই সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধের একই ধরনের নির্দেশ আসে। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেন। চেয়ারম্যান তা মহাপরিচালককে জানান এবং মহাপরিচালক সরাসরি মোবাইল অপারেটরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়।

সাক্ষী জানান, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি এ নির্দেশনার কথা জানতে পারেন। সেদিন বিটিআরসিতে একটি পূর্বনির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের সভা ছিল, যাতে তৎকালীন আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও প্রতিমন্ত্রী পলক অনলাইনে অংশ নেন। সভায় তার একটি আলোচ্য বিষয় থাকায় তিনি অফিসে উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি নিজে সভায় অংশ নেননি; তার তৈরি করা নথিপত্র মহাপরিচালককে সরবরাহ করেছিলেন। ওই দিনই নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়ে নথিতে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

২৮ জুলাই ইন্টারনেট চালুর নির্দেশ

সাক্ষীর জবানবন্দি অনুযায়ী, ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়টি মোবাইল অপারেটরগুলো বিটিআরসিকে জানায়। পরে বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যান বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী পলককে অবহিত করেন। ২৫ জুলাই পলকের নির্দেশে মোবাইল অপারেটরগুলোকে ফোরজি ভয়েস বা ভোল্টে সেবা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও নথিতে পরে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল বলে জানান সাক্ষী।

মাহদী আহমদ বলেন, ২৮ জুলাই আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে পলকের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। এতে ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, এমএফএস এবং মোবাইল অপারেটরগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ওই সভায় পলক তৎকালীন এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে চারটি মোবাইল অপারেটরের থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার বন্ধ রাখার নির্দেশনা বিটিআরসিকে দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

সাক্ষী আরও বলেন, ৩১ জুলাই পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার চালুর নির্দেশ দেন। এ সিদ্ধান্তের বিষয়েও নথিতে অনুমোদন নেওয়া হয়। মাহদী আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ২৮ জুলাই চালু হয়। ক্যাবল ইন্টারনেট ২৩ জুলাই সাময়িকভাবে চালু করা হয়েছিল এবং ৩১ জুলাই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়।

দেশজুড়ে বন্ধের বিষয়ে জানেন না সাক্ষী

জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ স্পষ্ট করেন, দেশজুড়ে মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ করা হয়েছিল, এমন বক্তব্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেন না।

তিনি বলেন, আমার কর্মক্ষেত্র মূলত মোবাইল অপারেটরগুলোর পরিচালন ও কারিগরি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করার বিষয়ে আমার সরাসরি জানা নেই; তবে চালুর বিষয়ে আমি জানি এবং ২৮ জুলাইয়ের সভার মাধ্যমে সে বিষয়ে অবগত হই।

মাহদী আহমদ জানান, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, সীমিতকরণ ও চালুর বিষয়ে ২০২৪ সালের ১৫, ১৬, ২৫, ২৮ ও ৩১ জুলাইয়ের নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত নথিতে তিনি নিজের স্বাক্ষর শনাক্ত করেন। একই সঙ্গে সহকারী পরিচালক ইয়াসমিন সুলতানা, পরিচালক গোলাম রাজ্জাক, তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান এবং বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন আহম্মেদের সইও তিনি শনাক্ত করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad