গ্যাস সংকটে বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা

গ্যাস সংকটে বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পাইপলাইনে টানা নিম্নচাপ ও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে সাধারণ পরিবারগুলো বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। রান্নার আরও নির্ভরযোগ্য বিকল্প খুঁজতে শুরু করায় বিক্রি অনেকটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

লাইনের গ্যাসে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় নবাবপুর ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে একটি ইলেকট্রিক বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন ফারজানা বেগম।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও প্রায়ই চাপ খুব কম থাকে, কিংবা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকে। বেশ কিছুদিন ধরে একটা ইলেকট্রিক চুলা কেনার পরিকল্পনা করছিলাম। এবার অবশেষে একটা কিনে ফেললাম।

১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার অনেক এলাকায় দিনের বেলা পাইপলাইনের গ্যাস একেবারেই মিলছে না বা সামান্য পাওয়া যাচ্ছে। অনেক রাতে মিলছে সরবরাহ। এলপিজি সিলিন্ডারের খরচ বেশি ও ঝামেলার হওয়ায় অনেক পরিবার এখন ঝুঁকছেন বৈদ্যুতিক গৃহস্থালি সামগ্রীর দিকে।

গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির ফলে এই পরিবর্তনের শুরু। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডির ঘাটতি থাকছে।

গত ২১ জুলাই বয়লার ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি এফএসআরইউ-এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্যাসে আরও প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি সরবরাহ কমে সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।

ব্যবহারে খরচ কম

বেসরকারি চাকরিজীবী শিমুল মাহমুদ জানান, তার পরিবারের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের চেয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার বেশ সাশ্রয়ী। প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করে তিনি দেখেছেন, বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করার পর তার দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে মাত্র ২৬ থেকে ২৮ টাকা।

নতুন মডেলের চুলাগুলোতে এসেছে নানামুখী উন্নতি। এখন সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে রান্না করা যায় এবং কয়েকটিতে আগুনের মতো তাপ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

নবাবপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে এটি আরও বাড়তে পারে।

গোমতী এন্টারপ্রাইজের মালিক নাজমুল হক জানান, আমদানি খরচ বাড়ার কারণে খুচরা মূল্য শেষ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘আমদানিকারকরা যখন নতুন অর্ডার দেবেন, তখন সরবরাহকারীরা দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে খুচরা পর্যায়েও দাম বেড়ে যাবে।’

ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান জানান, গ্রামাঞ্চলেও ইলেকট্রিক কুকার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে গুলিস্তানের খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ মাহিম জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাদের বিক্রি বেশ বেড়েছে।

ইনডাকশন নাকি ইনফ্রারেড

বাংলাদেশের বাজারে মূলত দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা প্রাধান্য পাচ্ছে–ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড।

ইনডাকশন চুলায় বিদ্যুৎ খরচ কম হয় এবং দ্রুত রান্না হয়, তবে এতে চৌম্বকীয় (ম্যাগনেটিক) হাঁড়ি-পাতিল প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ইনফ্রারেড কুকারে প্রায় সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা গেলেও এতে বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা বেশি এবং ব্যবহারের পরও এটি বেশ কিছুক্ষণ গরম থাকে।

সিঙ্গেল-বার্নার মডেলগুলোর দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে, আর ডাবল-বার্নার মডেলের দাম ৭ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের কাছে মিয়াকো, ওয়ালটন ও ভিশন ব্র্যান্ড বেশ জনপ্রিয়। তবে প্রিমিয়াম ফিলিপস মডেলগুলোরও ভালো চাহিদা রয়েছে।

গ্যাস খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম জানান, এই সংকট কেবল কোনো কারিগরি ত্রুটির ফল নয়, বরং এটি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার আরও গভীর দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তোলে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের দুটি এফএসআরইউ-এর মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাকআপ দেওয়ার সুযোগ খুব সামান্য থাকে। তা ছাড়া রুটিন মেরামতের জন্য প্রতি বছর একটি এফএসআরইউকে ১৫-২০ দিন অকার্যকর রাখতে হয়।

তামিম মনে করেন, এ ধরনের সংকট এড়াতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত এফএসআরইউ এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি

একসময় পুরোটাই আমদানিনির্ভর থাকলেও ইলেকট্রিক কুকারের বাজারে দেশীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ এখন ক্রমবর্ধমান।

উৎপাদকদের মতে, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হচ্ছে।

ওয়ালটন হোম অ্যান্ড কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সের চিফ বিজনেস অফিসার মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনায়েদ জানান, দেশে এর বার্ষিক চাহিদা ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, ‘ওয়ালটন বর্তমানে সেই চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মেটাচ্ছে। বিগত বছরের তুলনায় ওয়ালটন ইলেকট্রিক কুকারের চাহিদা আনুমানিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’

ওয়ালটন বর্তমানে ৩ হাজার ৮৯০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৫৯০ টাকার মধ্যে প্রায় ১৫টি ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড মডেল বিক্রি করছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad