এআই-এর যুগে মানবাধিকার: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

এআই-এর যুগে মানবাধিকার: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
Advertisement
Advertisement

আজকের দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার অত্যন্ত সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শহরের তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়।

এআই যেমন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারে, মাটির পুষ্টি ও ফসলের রোগ শনাক্ত করতে পারে কিংবা হৃদরোগ নির্ণয় করে মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে; তেমনই আবার অপরাধীদের হাতে পড়ে এটি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি যেমন দেখা গেছে—চিকিৎসক তাসনিম জারা ও জাহাঙ্গীর কবিরের ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে প্রতারক চক্র ওষুধ বিক্রি করেছে। পুলিশ অবশ্য ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাই বলা যায়, এআই এক দুইমুখী তলোয়ার। কিন্তু মূল সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা হলো প্রযুক্তির কোনো জবাবদিহি না থাকা।

রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকার

দার্শনিক টমাস হবসের তত্ত্ব অনুযায়ী, নিরাপত্তার বিনিময়ে নাগরিকেরা রাষ্ট্রের কাছে তাদের ক্ষমতা অর্পণ করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র সেই ক্ষমতা দিয়েই নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নাগরিকদের অধিকার হরণ করছে। অথচ প্রকৃত অপরাধীদের থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে।

শান্তিবিজ্ঞানী জোহান গালতুং দেখিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশে রাষ্ট্র অনেক সময় নিজেই নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরোক্ষ সহিংসতা তৈরি করে। যখন বাংলাদেশের জাতীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের আর কী-ই বা করার থাকে?

আইন বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্র বক্সী তার ‘দ্য ক্রাইসিস অব দ্য ইন্ডিয়ান লিগ্যাল সিস্টেম’ বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ‘আইনের শাসন’ (রুল অব ল) বদলে ফেলে ‘আইন দিয়ে শাসন’ (রুল বাই ল) কায়দা চালু করে। অর্থাৎ, আইনকে সাধারণ মানুষ ও বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার বানানো হয়।

এর স্পষ্ট উদাহরণ ছিল বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮) ও সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৩)। এই আইনগুলোর অস্পষ্ট ধারা ব্যবহার করে মুশতাক আহমেদকে জেলে যেতে হয় এবং কারাগারে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, দারিদ্র্য নিয়ে প্রতিবেদনে ফুল বিক্রেতা শিশুর ছবি ব্যবহার  করার কারণে সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে এসব দমনমূলক ধারা বাদ দেওয়া হয়।

শুধু বাংলাদেশ নয়; পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১-পরবর্তী ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’, ‘সিআইএসএ’, ‘ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভেইল্যান্স অ্যাক্ট’-এর মতো আইন কিংবা ইসরায়েলি ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর সরকারি নজরদারি চালানোর নজির রয়েছে।

সাইবার অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের ভূমিকা

সাইবার অপরাধ বন্ধে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা দেখা যায়। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আশ্রয়েই এসব অপরাধ পরিচালিত হয়। এসব অপরাধের মধ্যে আছে:

বিকাশ প্রতারণা: নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রতারক চক্র স্থানীয় প্রভাবশালী ও প্রশাসনিক আশ্রয়ে কাজ চালায়। সাধারণ মানুষ টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হলেও সাইবার সেল ছিল নীরব।

রেলওয়ের টিকিট কালোবাজারি: অনলাইন টিকিটের সার্ভার ডাউন থাকা বা কালোবাজারিদের দখলে চলে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা, যা থামাতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

আরও পড়ুন

অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে অবৈধ অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনে কোটি কোটি টাকা পাচার হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যক্তিগত ফোনালাপে আড়ি পাততে যতটুকু উৎসুক, এসব অপরাধী চক্র দমনে ততোটা কার্যকর ভূমিকা রাখে না।

যে মানবাধিকারগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে:

১. ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার: কোটি কোটি নাগরিকের এনআইডি তথ্য ফাঁস হওয়া।

২. বাক-স্বাধীনতা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্টের ব্যাপ্তি কমিয়ে দেওয়া ও আইনি ভয় দেখানো।

৩. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: অনলাইন লেনদেনে নিরাপত্তা না থাকা এবং ডিজিটালি প্রতারিত হওয়া।

৪. সমাবেশের অধিকার: ফেসিয়াল রিকগনিশন বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত ও দমন করা।

করণীয় ও সুপারিশ

এআই-এর এই যুগে নাগরিকদের অধিকার ও গোপনীয়তা রক্ষায় নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

১. সর্বজনীন প্রাইভেসী আইন: ইউরোপের জিডিপিআর-এর মতো শক্তিশালী নীতিমালা ও ডিপফেক প্রতিরোধের আইন তৈরি করা।

২. আইন সংশোধন: সাইবার আইন থেকে মানবাধিকারবিরোধী ও অস্পষ্ট ধারাগুলো স্থায়ীভাবে বাতিল করা।

৩. স্বাধীন তদারকি: আদালতের অনুমতি ছাড়া আড়ি পাতা বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

৪. কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি: সাইবার সিকিউরিটি বাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়ে আসল অপরাধীদের (বিকাশ প্রতারণা, ব্যাংক হ্যাকিং, অনলাইন জুয়া) ধরা।

৫. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে স্বচ্ছতা আনতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুশীল সমাজের কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা।

৬. মানবাধিকার প্রভাব মূল্যায়ন: যেকোনো নতুন প্রযুক্তি বা নজরদারি ব্যবস্থা চালুর আগে মানবাধিকারের ওপর তার প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা।

উপসংহার

সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না; বরং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত করেই সাইবার নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব। মানুষকে নজরদারিতে রাখার বদলে মানবাধিকার রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত একবিংশ শতাব্দীর মূল লক্ষ্য।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad