জাতিসংঘের বৈঠককে ইরান যুদ্ধ নিয়ে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের আশায় গত এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একইসঙ্গে ইয়েমেনের হুথি হামলার মধ্যেও সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সোমবার দিনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গ্রিনিচ মান সময় রাত ২টা ১৩ মিনিটে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে আসে। আগের দিনের তুলনায় জ্বালানির দাম কমেছে ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর আগে শুক্রবার লেনদেন শেষে ব্রেন্টের দাম কমেছিল শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে। এতে আগের দিনের তুলনায় ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ দাম কমে। এর আগের সেশনে এই তেলের দাম কমেছিল ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনে চলতি সপ্তাহে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তেলের দামের ওপর থাকা ঝুঁকির অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমেছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক পথ তৈরি হতে পারে- এমন আশায় তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকির একটি অংশ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
‘তবে এই আশা বাস্তবসম্মত প্রমাণিত হবে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। সময়ই এর উত্তর দেবে’ বলে জানান তিনি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক তেলের বাজার মধ্যস্থতাকারী জানান, ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে গেছে। ইরান যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশিরভাগ সময়ই ১০০ ডলারের উপরে থাকায় মানুষের মনে এটিই স্বাভাবিক দাম হিসেবে গেঁথে গিয়েছিল। কাজেই দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিনিয়োগকারী হয়তো মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে অক্টোবর মেয়াদের চুক্তি থেকে নভেম্বর মেয়াদের চুক্তিতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার মধ্যেই রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনা ঘটেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী। মার্কিন হুমকি উপেক্ষা করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পেজেশকিয়ান এ সপ্তাহে নিউইয়র্কে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি শনিবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ফেরার জন্য ইরান মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের শর্ত জানিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ বন্ধে আশার আলো দেখা গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখনো তুঙ্গে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি স্থাপনাতেও হামলার দাবি করেছে তারা। ইয়ানবু দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র।
হুথিদের হামলায় সৌদি আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাস ও আগামী মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। এর আগে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কিছু তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
ওই হামলার পর সৌদি আরব হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চীনের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে। আগস্টে যা নেমে গিয়েছিল দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেলে। ২০১৩ সালের পর এটিই ছিল সৌদির সর্বনিম্ন রপ্তানি।
জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলেন, সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী রয়েছে। তাদের হিসাবে, গত ১০ দিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মোট তেল সরবরাহের গড় ছিল দৈনিক এক কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল। এটি ২০২৫ সালের গড় সরবরাহের তুলনায় ৬১ লাখ ব্যারেল কম।
জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলেন, ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে সৌদি আরব থেকে।’ স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণ গড়ে দৈনিক ২৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা আগস্টে ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।


