ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে ইরান চুক্তিতে না এলে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে অথবা দেশটির নেতারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অবশ্য এই হুমকি উপেক্ষা করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে যাবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তিনি এবারই পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রস্তুত আছেন।
ট্রাম্পের হুশিয়ারির পর ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নতুন কোনো হামলা হলে এর কঠোর জবাব দেবে তেহরান।
মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি লোহিত সাগর ও বাব-আল মান্দেব প্রণালিতে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের কঠোর বাধার মুখে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যেই রোববার এই পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির ঘটনা ঘটল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বন্ধে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গত কয়েক মাস ধরেই কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। কোনো পক্ষই একে অপরকে ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। এরই মধ্যে সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও গভীর করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উপসাগরীয় এলাকায় নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপে রোববার ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নেতাদের একটি চুক্তিতে আসতে হবে, নইলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হবে অথবা তাদের নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প বারবার বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তিনি তা বাস্তবায়ন করেননি।
এর আগে ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, নতুন কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী পাল্টা অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদেরও এই সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইরানের সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, তারা এমন একটি হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে। তবে ওই তথ্যের বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এরইমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এই সংঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিকভাবে যুদ্ধ শুরু করার পর ইরানের হামলার মুখে প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় তাদের অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে হুট করেই তীব্র হয়ে ওঠে গৃহযুদ্ধ। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা আকস্মিক সামরিক অগ্রগতি অর্জন করে।
রয়টার্সের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতভর বিস্ফোরণের পর রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশে আকাশে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুথি হামলার বিষয়ে একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সৌদি ও ইয়েমেনে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের আরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য বিমান চলাচল বাতিল ও আকাশপথ বন্ধ হওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য সৌদি আরব এ হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে চালানো আরও কয়েকটি হামলা ঠেকিয়ে দিয়েছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি সৌদি আরবকেও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। একদিকে ইয়েমেনে হুথিদের আরও ভূখণ্ড দখল ঠেকাতে বিমান হামলা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা এড়াতে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে।
ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এখন তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী জাহাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ অবরোধের সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ নৌ চলাচল বন্ধ থাকায় এবং হুথি বাধায় লোহিত সাগরেও তেল পরিবহন সীমিত হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বৈশ্বিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক তেলের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধের কারণে ইরান নিজস্ব তেল বিক্রি করতে পারছে না। এতে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রোববার ইরান আবারও জানিয়েছে, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের চুক্তির শর্তগুলো তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, শত্রুদের মোকাবিলা করতে এবং কূটনীতির মাধ্যমে অর্জনগুলো সুসংহত করতে ইরানকে একই সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং আলোচনাও চালিয়ে যেতে হবে।


