বাংলাদেশে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একাধিপত্য থাকলেও এবার একটি অভিনব চিত্র দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের একাধিপত্য দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে আন্দোলনে নামছে শিবির সমর্থক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এনিয়ে আছে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। কোথাও কোথাও সংঘর্ষে জড়াচ্ছে দুই সংগঠন।
এর মধ্যে রাজধানী লাগোয়া গাজীপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘাত হয়েছে। এর আগে সংঘাত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামের একটি সরকারি কলেজে। সে সময়ই ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদল হলের নিয়ন্ত্রণ নিতে এলে ছেড়ে কথা না বলার হুঁশিয়ারি দিতে থাকে শিবিরকর্মীরা।
এর মধ্যে ঢাকার দুটি কলেজে ছাত্রদলের সক্রিয় হওয়াকে কেন্দ্র করে ‘নিরপেক্ষ’ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে, যারা আসলে কোন পক্ষের তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাত থেকে এক ‘অদৃশ্য শক্তি’র হাতে চলে যায়-যারা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ বলে দাবি করতে থাকে। গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই তারা দেশে ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ এবং ‘রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসে’র দাবিতে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলে। তাদের পছন্দমতো উপাচার্য নিয়োগ না হলে ক্যাম্পাসের কার্যক্রমও বন্ধ করে দিত তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার বদল হলেও ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে নারাজ তারা। অন্যদিকে, অন্তবর্তী সরকারের সময় চাপে থাকা ছাত্রদলও এখন নিজেদের হিস্যা বুঝে পেতে মরিয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, অনেক ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত বলা হলেও আসলে রাজনীতি আছে। হয়তো গণরুম-গেস্টরুম নেই। কিন্তু ছাত্রসংসদ বা অন্য কোনো নামে হলেও ক্যাম্পাস দখলে রাখার প্রয়াস আছে। এতদিন যারা বিভিন্ন নামে ক্যাম্পাস দখলে রেখেছিল, এখন নির্বাচনের পর ছাত্রদল তাদের চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে কিছুটা অস্থিরতা আছে।
তিনি বলেন, ‘যারা এতদিন একচ্ছত্রভাবে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করেছে-তারাই আধিপাত্য ধরে রাখার চেষ্টায় নানা কিছু করছে। আবার যারা ক্ষমতাসীনদের সমর্থক, তারাও নিয়ন্ত্রণ বেশিদিন ছাড়তে চাইবে না। ফলে সামনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ছড়ানোর আশঙ্কা আছে।’
ঢাবিতে ফুল পেয়েছেন নিয়াজ, ডুয়েটে ইকবালকে নিয়ে সংঘর্ষ
গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের ‘ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-ডুয়েটে উপাচার্য হিসেবে মোহাম্মদ ইকবাল দায়িত্ব নিতে গেলে বাধা দেয় ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা। দুদিন ধরে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘাত চলতে থাকে।
ডুয়েট উপাচার্য ছিলেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। তার বিরোধিতাকারীরা দাবি করছেন, ডুয়েট থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে। যদিও দেশে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের প্রবণতা নতুন নয়।
উপাচার্য এখনো ক্যাম্পাসে থাকতে পারছেন না। তিনি কখনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরিত্যক্ত কার্যালয়ে, আবার কখনো গাজীপুর মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তবে গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বহিরাগত’ উপাচার্য নিয়াজ আহমেদকে ঠিকই বরণ করে নেয় ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এই অধ্যাপককে ‘অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন’ হিসেবে প্রচারেও নামে তারা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উপাচার্যের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
উপাচার্যকে ডাকসু নেতাদের হুঁশিয়ারি
জাতীয় নির্বাচনে আগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৎপরতা বাড়াতে চাইলে ব্যাপক বাধার মুখে পড়ে। তবে নির্বাচনের পর থেকে নিজেদের অবস্থান একটু করে সংহত করার চেষ্টা করছে তারা।
গত মাসে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক সমিতির সাবেক নেতা ওবায়দুল ইসলামকে। এরমধ্যেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুতে ছাত্রশিবির সমর্থিক প্যানেল থেকে নির্বাচিত নেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন। ডাকসু নেতারা প্রকাশ্যে ‘মব করার’ হুঁশিয়ারিও’দিয়েছেন। তবে প্রথমবারের মতো পাল্টা কঠোর সুরে কথা বলার চেষ্টা করেছেন উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এর আগের উপাচার্য, প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টরের সরাসরি মদতে ক্যাম্পাসে মব করা হতো। ক্যাম্পাসে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ডাকসু নেতারা প্রকাশ্যে শিক্ষক পিটিয়েছেন এবং অনেক শিক্ষককে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। এসব কি সাধারণ শিক্ষার্থীর কাজ বলে মনে হয়?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন শিক্ষক বলেন, ‘কখনো ছাত্রসংসদের কিছু নেতা আবার কখনো সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থী-কিছু চিহ্নিত মানুষই বারবার মব সৃষ্টি করে ক্যাম্পাসে ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে।’
উপাচার্যের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের আচরণ ও বাচনভঙ্গির সমালোচনা করে প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ‘এই বিষয়গুলো সংশোধনীয়। তাদের বিবেকের জায়গাকে আরও শাণিত করতে হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথেও শঙ্কা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মহাম্মদ বাবর।
তিনি বলেন, ‘নানা ধরনের অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের মধ্যেই আমাদের রাজনীতি করতে হয়েছে।’
ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম নিয়ে সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের অক্টোবরে আমরা প্রকাশ্যে এসেছি। এখন আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতি আরও বেড়েছে।’
গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে আবির্ভূত হয়েছে ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ নামের আরেকটি সংগঠন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান টাইমসকে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা বিষয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করেছে ছাত্রদল ও শিবির। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে অনেকের স্বার্থে আঘাত লাগে। ফলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গুপ্তভাবে ফেইক আইডি বা পেইজ দিয়ে মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ফলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।’
ক্যাম্পাসের দখলদারত্ব বজার রাখার চেষ্টায় ক্যাম্পাসের স্নায়ুযুদ্ধ আস্তে আস্তে বিভিন্ন সংঘর্ষের দিকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভান তাহসীভ।
মধ্যরাতে ইডেন কলেজের অস্থিরতায় কারা
গত ১০ মে মধ্যরাতে ইডেন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামতে দেখা গেছে কিছু শিক্ষার্থীকে। ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে কলেজের মূল ফটকের তালা ভেঙে সড়কে নেমে পড়ে তারা।
তবে এই ঘটনাকে ‘সুসংগঠিত’ বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ। তারা বলেছেন, কলেজের ৬টি আবাসিক হলে অন্তত ১০ হাজার শিক্ষার্থী থাকে। অথচ রাজনীতির বিরোধীতার নামে কয়েকশ শিক্ষার্থী মিলে ‘মব’ সৃষ্টি করেছে।
হাসনা বেগম ছাত্রী নিবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক সালমা হক কচি টাইমসকে বলেন, ‘দিনের বেলা কেন তারা দাবি-দাওয়া না জানিয়ে রাতের বেলা আন্দোলনে নামে সেটার কারণ তারাই ভালো জানেন।’
কলেজের একজন প্রাক্তন অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির চর্চা আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবেও। কাউকে সংগঠন করার জন্য জোর করতে পারেন না, তেমনি কাউকে সংগঠন করতে নিষেধও করতে পারেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছরে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন সাধারণ শিক্ষার্থী শব্দটাই বিতর্কিত হয়ে গেছে। তাই এসব আন্দোলনের কারণ আপনারাই (সাংবাদিকরাই) খুঁজে বের করুন। এটা তো আপনাদেরও দায়িত্ব।’
কুয়েটে কী চলছে
ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি থাকবে কি না তার পক্ষে-বিপক্ষের অবস্থান নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে শিক্ষকরা আক্রান্ত হলে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদকে যখন কুয়েটের উপাচার্য করা হয় তখন তাকে ‘বিএনপি মনা’ আখ্যা দিয়ে ক্ষুব্ধ হয় ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’। ছাত্রদল সে সময় এই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’দের হামলারও শিকার হয়, এরপর পাল্টা হামলায় যায় তারাও। পরে অন্তবর্তী সরকারের ইচ্ছায় ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল উপাচার্য মাছুদকে সরে যেতে হয়। এরপর ক্লাস বর্জন অব্যাহত রাখেন শিক্ষকরা, টানা ১৬০ দিন ক্লাস কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৪ মার্চ উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রেখে সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানারে এসব অপকর্ম করেছে। তবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের তৎপরতা এখনো সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি।’
‘প্রকাশ্য ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে কোনো গুপ্ত সংগঠন এককভাবে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখে না, বলেন উপাচার্য।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদক জান্নাতুন নাঈম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদক কে এম জাবিদ বিন খালিদ)


