আইএফআইসি ব্যাংক: অনিয়মের রিলে রেস

আইএফআইসি ব্যাংক: অনিয়মের রিলে রেস
Advertisement
Advertisement

আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের গল্পটি যেন একটি রিলে রেসের মতো। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের হাতে থাকা ব্যাটনটি তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদের কাছে। কিন্তু হাতবদল হলেও অনিয়মের একই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি তদন্ত প্রতিবেদন, আইএফআইসি ব্যাংকের দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন, পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী, পেমেন্ট ভাউচার, ভিডিও রেকর্ড এবং ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের প্রভাব থেকে আইএফআইসি ব্যাংককে মুক্ত করতে এর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তেই বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

একই সময়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকটি তদন্তে দেখা গেছে, আইএফআইসি ব্যাংকের একজন সাবেক চেয়ারম্যান অন্যের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। টাইমস-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, একসময় সালমান এফ রহমানের প্রভাবের সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হলেও, তিনি এখন পরিচালনা পর্ষদে ফিরে আসতে এবং ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংক লিমিটেড ১৯৮৩ সালে সম্পূর্ণ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বর্তমানে এই ব্যাংকের ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক সরকার। বাকি শেয়ারের মালিক পরিচালক, উদ্যোক্তা (স্পন্সর) ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাবেক ব্যাংকার এবং পেশাদারদের নিয়ে একটি নতুন পর্ষদ গঠন করে। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সাবেক ব্যাংকার মো. মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল ব্যাংক থেকে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ অনুমোদন এবং বছরের পর বছর ধরে চলা সুশাসনের অভাব দূর করা।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার পরিবর্তে নতুন পর্ষদের সদস্যরা নিজেই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তদন্ত দল তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করা বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, তদন্তের অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণ ছিল বর্তমান পর্ষদ সদস্যদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়।

ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী, একজন পরিচালক সর্বোচ্চ ছয়টি পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভা, একটি অডিট কমিটির সভা এবং একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার জন্য সম্মানি বা ভাতা পেতে পারেন। প্রতিটি সভার জন্য অনুমোদিত সর্বোচ্চ ভাতা হলো ১০ হাজার টাকা। এই সীমার বাইরে কোনো অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার নিয়ম নেই।

তবে তদন্ত প্রতিবেদন, পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী এবং টাইমসে’র হাতে আসা পেমেন্ট ভাউচার অনুযায়ী, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান ক্রেডিট ঝুঁকি কর্মকর্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সম্মতি (আইসিসি) প্রধান নিয়োগের জন্য ইন্টারভিউ বোর্ড ও তদন্ত কমিটির নামে বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত সভা করা হয়েছে। পরিচালকেরা এসব অতিরিক্ত সভার জন্যও ভাতা গ্রহণ করেছেন।

নথিপত্রে দেখা গেছে, কোনো অনুমোদন ছাড়াই এই বাড়তি সভাগুলোর মাধ্যমে পরিচালকেরা প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন।

শুধু আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মধ্যেই অভিযোগ সীমাবদ্ধ নয়। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব নিয়োগ নীতিমালার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, বয়সসীমা এবং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল না। আবার কিছু ক্ষেত্রে আগের চাকরিদাতার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র ছিল না। এমনকি কয়েকজন প্রার্থীর প্রয়োজনীয় যোগ্যতাই ছিল না।

আরও পড়ুন

সীমানা লঙ্ঘন

এসব ছাড়াও তদন্তে আরও দেখা গেছে, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সীমা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা কেবল নীতি নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চেয়ারম্যান বা পরিচালকেরা সরাসরি দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ বারবার এই সীমা লঙ্ঘন করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসের ৩৮  কর্মদিবসের মধ্যে ২২ দিনই আইএফআইসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন।

তদন্ত দল বলছে, বিষয়টি কেবল কার্যালয়ে তার উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ওই সময়ে তিনি ব্যাংকের বেশ কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে স্টক এক্সচেঞ্জ শাখার অধীনে মেঘনা করপোরেশন, প্রিন্সিপাল শাখার অধীনে সিলভার গ্রুপ, নারায়ণগঞ্জ শাখার অধীনে ফ্লেমি ফ্যাশন এবং গুলশান শাখার অধীনে মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত দল মনে করে, বড় ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে এ ধরনের সরাসরি বৈঠক পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা দুর্বল করে দিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিলীকরণ, আদায় এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আসল পরীক্ষা কেবল নতুন পর্ষদ নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেই পর্ষদের বিরুদ্ধেও যদি অভিযোগ ওঠে, তবে একই ধরনের নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংকিং সুপারভিশন বিভাগ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে সুপারিশ করেছে। এখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগের। প্রয়োজন হলে তারা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুনতে পারেন অথবা সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে।’

অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাবে আইএফআইসি ব্যাংক জানিয়েছে, চেয়ারম্যান ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন এমন কোনো অভিজ্ঞতা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নেই। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে তিনি ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

ব্যাংকটির দাবি, সব নিয়োগ প্রক্রিয়া আইএফআইসি ব্যাংকের নিজস্ব নিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া পরিচালকদের দেওয়া সমস্ত পর্ষদ সভার ভাতা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত ও পরিশোধ করা হয়েছে।

পরিচালকদের যুক্তরাজ্য সফরের বিষয়ে ব্যাংকটি জানায়, আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের পর্ষদের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচালকেরা লন্ডন সফর করেন। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী অর্থ পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত (অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং) একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিতেই এই সফর করা হয়েছিল।

নিয়ন্ত্রণের নতুন লড়াই

এদিকে বর্তমান পর্ষদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের মধ্যেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

টাইমসে’র হাতে আসা নথিপত্রে দেখা গেছে, ইতোপূর্বে পরিচালনা পর্ষদ থেকে অপসারিত সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাদল আবারও পরিচালক হিসেবে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। নিজের প্রত্যাবর্তনের জন্য তিনি ইতোমধ্যে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপও নিয়েছেন।

তবে তার এই প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন এবং আইএফআইসি ব্যাংকের দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাদল তার নিজের প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীর নাম ব্যবহার করে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাইমসে’র অনুসন্ধানেও এই দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

লুৎফর রহমান বাদল টাইমস’কে বলেন, তিনি পর্ষদে ফিরতে চান। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কারণে তিনি ফিরতে পারছেন না।

বর্তমান পর্ষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাদল বলেন, ‘বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পূর্বের অপ্রকাশিত ঋণ উদ্ধারে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পরিচালনা পর্ষদে যোগ দিতে ইচ্ছুক যেকোনো ব্যক্তিকে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad