আবারও এক অবিশ্বাস্যভাবে খেলায় ফিরে এসে ইংরেজদের মন ভেঙে দিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে দুটি গোল করে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
দ্বিতীয়ার্ধে অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেওয়ার পর মনে হচ্ছিল, প্রায় ছয় দশক পর ইংলিশদের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আরও একবার দেখিয়ে দিল যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকেও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। এনজো ফার্নান্দেজ দূর থেকে এক জোরালো শটে গোল করে খেলায় সমতা ফেরান। এরপর অতিরিক্ত সময় লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে এই নাটকীয় জয় এনে দেন।
এই জয়ের ফলে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, যেখানে লিওনেল স্কালোনির দল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে।
ম্যাচের বেশিরভাগ সময় সুন্দর ফুটবলের চেয়ে শারীরিক শক্তি ও খেলোয়াড়দের মধ্যকার ঠোকাঠুকির লড়াইটাই বেশি চোখে পড়েছে। প্রথম ৪৫ মিনিটে একটি শটের জন্য দর্শকদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ৩২ মিনিটে ইংল্যান্ডের জন স্টোন্সের নেওয়া শটটিই ছিল প্রথমার্ধের একমাত্র গোলমুখে আক্রমণ। অন্যদিকে, মাঠের বাইরে ও ভেতরে দুই দলের খেলোয়াড়রা বারবার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ায় প্রথমার্ধেই প্রায় কুড়িটি ফাউল হয়। ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও এনজো ফার্নান্দেজ একটি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন এবং পুরো ম্যাচ জুড়েই এই উত্তেজনা বজায় ছিল। লিওনেল মেসিকে ফাউল করার জন্য অ্যান্ডারসনকে হলুদ কার্ড দেখতে হয়, এবং প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে মরগান রজার্সকে পেছন থেকে টেনে ধরার কারণে হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটাও ছিল একই রকম উত্তেজনাকর। শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হুলিয়ান আলভারেজের দুটি দারুণ শট রুখে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। তবে ম্যাচের ধারার বিপরীতে গিয়ে ৫৫ মিনিটে প্রথম গোল করে বসে ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইনের একটি চমৎকার পাস থেকে বল পান ডেকলান রাইস। রাইস বল বাড়িয়ে দেন ডানপ্রান্তে থাকা মরগান রজার্সকে। অ্যাস্টন ভিলার এই ফরোয়ার্ডের ক্রস থেকে একদম কাছ থেকে বল জালে জড়ান অ্যান্থনি গর্ডন। এর কিছুক্ষণ পরেই ডিজেড স্পেন্স এক দুর্দান্ত স্লাইডিং ট্যাকল করে গুলিয়ানো সিমিওনেকে গোল করা থেকে বঞ্চিত করেন এবং ইংল্যান্ডের লিড বজায় রাখেন।
পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনা তাদের পুরো শক্তি নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার দুইবার গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, যার মধ্যে একবার তার নেওয়া হেডার পোস্টে লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড রক্ষণভাগকে আরও মজবুত করতে পাঁচ ডিফেন্ডারের ছক বেছে নেয় এবং পেছনে গুটিয়ে যায়। রক্ষণভাগ সামাল দেওয়ার জন্য ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল ড্যান বার্ন এবং নিকো ও’রাইলিকে মাঠে নামান। কিন্তু রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় বাড়ানোর পরেও আর্জেন্টিনার ক্রমাগত আক্রমণ ঠেকানো যায়নি। অবশেষে ৮৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভেঙে যায়। পিকফোর্ড এর ঠিক আগেই ফার্নান্দেজের একটি শট আটকে দিয়েছিলেন, কিন্তু এবার কর্নার থেকে মেসির বাড়িয়ে দেওয়া পাস থেকে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে বল জালে জড়ান এনজো ফার্নান্দেজ।
কিন্তু ইংল্যান্ডের জন্য আরও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছিল অতিরিক্ত সময়ের দশম মিনিটে। ৩৯ বছর বয়সেও নিজের দক্ষতার বিন্দুমাত্র কমতি না দেখিয়ে লিওনেল মেসি ডানপ্রান্ত থেকে একটি চমৎকার ক্রস বাড়ান। সেখান থেকে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডারে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন মার্টিনেজ এবং দলের জয় নিশ্চিত করেন। এই গোলের সাথে সাথেই আর্জেন্টিনার সাইডবেঞ্চ ও মাঠের খেলোয়াড়রা বন্য উল্লাসে মেতে ওঠেন।
ইংল্যান্ড যখন ম্যাচে এগিয়ে ছিল, তখন টুখেলের পাঁচ ডিফেন্ডার খেলানোর সিদ্ধান্তটি ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। অতিরিক্ত ডিফেন্ডার নামানো সত্ত্বেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার জন্য ইংল্যান্ডের অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হলো। অন্যদিকে, শেষ মুহূর্তে মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে আর্জেন্টিনা পরপর দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠলো। একই সাথে ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।


