বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা দেশের ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আবারও মালিকপক্ষের কাছে ফিরতে শুরু করেছে। দুই বছর আগে অনিয়ম ও সুশাসনের সংকটের মধ্যে যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব বোর্ড বসিয়েছিল, এবার সেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অবসান ঘটছে আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে।
এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বুধবার আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই প্রক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমে আরও ১০টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু আগের পরিচালকদের কাছে ‘ফিরিয়ে দেওয়া’ নয়। নতুন পর্ষদ অনুমোদনের আগে প্রকৃত মালিকানা, শেয়ারধারীদের যোগ্যতা, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং গত দুই বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক-নিযুক্ত বোর্ডের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(২) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠিত পরিচালনা পর্ষদ সর্বোচ্চ দুই বছর দায়িত্ব পালন করতে পারে। ফলে যেসব ব্যাংকের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সেগুলোর জন্য নতুন আইনি কাঠামো অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
টাইমসের হাতে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, পর্ষদের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর গত দুই বছরের আর্থিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন।
দ্বিতীয়ত, দুই শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারীদের হালনাগাদ আল্টিমেট বেনিফিশিয়াল ওনার (ইউবিও) রিপোর্ট সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা।

তৃতীয়ত, দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনগতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে, সে বিষয়ে আইনি মতামত গ্রহণ।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ৪৭ ধারার ক্ষমতাবলে যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করেছিল এবং যেগুলো রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় নয়, বর্তমানে সেই তালিকায় রয়েছে ১১টি ব্যাংক।
এগুলো হলো আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংক-নিযুক্ত পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ ২০২৬ ও ২০২৭ সালের বিভিন্ন সময়ে শেষ হবে।
এই ধারাবাহিকতার প্রথম বাস্তবায়ন হয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক এটির পরিচালনা পর্ষদে ১৪ জন স্পন্সর ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এবং তিনজন প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দেয়।
একই সঙ্গে পরিচালক খলিলুর রহমানকে ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার আগে দুটি বিমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূর্বে নিয়োগ পাওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের বহাল রাখা হয়েছে এবং চেয়ারম্যান নিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ শেয়ারহোল্ডারদের দিলেও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই অভ্যন্তরীণ নথিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রতিটি ব্যাংকের হালনাগাদ কুইক রিভিউ রিপোর্ট, সিআরআর ও এসএলআরের তথ্য, আরোপিত জরিমানা, বিভিন্ন সূচকের বর্তমান অবস্থা, এলসি ডিউ, এক্সপোর্ট ওভারডিউ এবং ব্যাংক বা পরিচালনা পর্ষদ সম্পর্কে কোনো বিরূপ পর্যবেক্ষণ থাকলে তা জরুরি ভিত্তিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক-নিযুক্ত বোর্ডগুলোর কর্মমূল্যায়ন করা হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের একাধিক ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত ও সুশাসনের সংকটের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নিজস্ব পরিচালক নিয়োগ করে। সেই সিদ্ধান্তকে ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।


