বাজেটে শিক্ষা, জেন্ডার ও জলবায়ু খাতে টেকসই কাঠামোর তাগিদ

বাজেটে শিক্ষা, জেন্ডার ও জলবায়ু খাতে টেকসই কাঠামোর তাগিদ
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের শিক্ষা, জেন্ডার ও জলবায়ু খাতে টেকসই ও জনবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাওয়া এই রূপরেখায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং পরিবেশগত সংকটের মুখে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও তরুণদের সুরক্ষায় একটি ভবিষ্যৎমুখী সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সময় এখনই: নারী, তরুণ ও জলবায়ু সুরক্ষায় জনবান্ধব বাজেট’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সংলাপে বিগত পাঁচ বছরের (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬) জাতীয় বাজেটের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে দেখানো হয় যে, দেশের সামগ্রিক বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জেন্ডার বাজেটের মতো টেকসই উন্নয়নের প্রধান খাতগুলোতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় স্থবির বা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

গত পাঁচ বছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং জেন্ডার বাজেটের আকার জিডিপির ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে সংকুচিত হয়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশে অবস্থান করছে।

এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের সহিংসতা প্রতিরোধ ও আইনি সহায়তার মতো উদ্যোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ মাত্র ২ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যার ফলে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও এনডিসি বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন) সাইমুম পারভেজ জানান, সরকার এখন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

জলবায়ু অর্থায়ন, ঋণ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন ট্রেডিংয়ের মতো নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে, যেখানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও যুব উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে একটি জলবায়ু-সচেতন ও জেন্ডার-রেসপনসিভ উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

এই সবুজ উদ্যোগের সঙ্গে একমত পোষণ করে পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. গোলাম মোছাদ্দেক জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৫টি খাতে ক্লাইমেট জাস্টিস যুক্ত করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা শুধু জিডিপি বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর জোর দেন এবং নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তার মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপের পরামর্শ দেন।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন জানান, যুব উন্নয়ন বাজেটকে এখন বছরব্যাপী কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়েছে এবং তরুণদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এসএমই ঋণ ও আউটসোর্সিংয়ে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদ সায়মা হক বিদিশা সতর্ক করে বলেন, জেন্ডার বাজেটকে কেবল নারীদের আলাদা বরাদ্দ ভাবলে চলবে না, বরং এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামো হওয়া উচিত, যেখানে অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি ও নিরাপদ পরিবহনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

জলবায়ু অর্থায়ন প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ আহসান উদ্দিন আহমেদ জানান, গত এক দশকে ২৫টি মন্ত্রণালয় যুক্ত হলেও দুর্বল জবাবদিহিতার কারণে গড় বাস্তবায়ন সক্ষমতা মাত্র ৭ শতাংশে আটকে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি ঋণনির্ভর উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তৃণমূলের প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে নারী কৃষকদের জন্য মানসম্মত বীজের ন্যায্য বণ্টন ও সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান।

আসন্ন বাজেটের জন্য সংলাপে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সুপারিশ পেশ করা হয়। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা, বিশেষ ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের পরিধি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার খাতে পৃথক জেন্ডার বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

পাশাপাশি ২০২৮ সালের মধ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করা, যুব বাজেটের স্বচ্ছতার জন্য ‘ইয়ুথ বাজেট স্টেটমেন্ট’ ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালু করা এবং উপকূলীয় ও ডিজিটাল খাতের তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা তহবিল ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

জলবায়ু খাতের সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনের জন্য সুনির্দিষ্ট পৃথক বাজেট কোড তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু তহবিল সরাসরি হস্তান্তরের তাগিদ দেওয়া হয়।

সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, ট্রান্সজেন্ডার ও প্রতিবন্ধী তরুণরা অংশ নিয়ে কার্যকর সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন সামষ্টিক বাজেট প্রণয়নের জোরালো দাবি জানান।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad