২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কথা মনে পড়লে আমার প্রথমে বিশ্বরাজনীতি মনে পড়ে না, মনে পড়ে নিজের বয়সটার কথা। আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, কে কোথায় পড়ব, ভবিষ্যৎ কী হবে, এসব নিয়েই ব্যস্ত। ঠিক পাঁচ দিন পর টেলিভিশনের পর্দায় নিউইয়র্কের সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখতে পেলাম। একটি উড়োজাহাজ টুইন টাওয়ারে আঘাত করল, তারপর আরেকটি। আগুন, ধোঁয়া, আতঙ্ক, তারপর ভবন ধসে পড়ার দৃশ্য। আমরা দেখছিলাম, কিন্তু তখনো বুঝিনি, আমাদের সামনে শুধু একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ঘটছে না; বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর রাজনীতি, নিরাপত্তাবোধ, যুদ্ধের ভাষা এবং একে অন্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও।
আজকের মতো তখন হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। ফেসবুক আমাদের জীবনে আসেনি, টুইটারও ছিল না। বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিল সীমিত। এখন বড় কোনো ঘটনা ঘটলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংবাদ, মতামত, ভুল তথ্য, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং অসংখ্য ব্যাখ্যা একসঙ্গে আমাদের সামনে এসে পড়ে। তখন ঘটনা আর তার ব্যাখ্যার মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল। ৯/১১-এর দৃশ্য আমরা প্রথমে দেখেছি, এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ বুঝেছি অনেক পরে।
এর ছয় বছর পর, ২০০৭ সালে, আমি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে যাই। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৃত্তিতে Near East and South Asia Undergraduate Exchange Program-এর অধীনে University of Wisconsin-La Crosse-এ পড়ার সুযোগ হয়েছিল। আমার কাছে সেটি শুধু উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা ছিল না, ৯/১১-পরবর্তী আমেরিকাকে কাছ থেকে দেখারও সুযোগ ছিল। মরক্কো, মিসর, ইরান, ভারত, পাকিস্তান, জর্ডান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের তরুণদের সঙ্গে একই পরিবেশে থেকেছি। অনেকের সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব আজও আছে। আমার রুমমেট ছিলেন একজন আমেরিকান।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুসলিম শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনও খুব কাছ থেকে দেখেছি। রমজান মাসে আমরা রোজা রাখতাম। আমেরিকান বন্ধুরা জানতে চাইত, এত লম্বা সময় না খেয়ে থাকি কীভাবে, পানি পর্যন্ত খাই না কেন, রোজার মানে কী। প্রশ্নগুলো ছিল সহজ, কখনো খুবই সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ আলাপগুলোর গুরুত্ব পরে বুঝেছি। সংবাদে বা রাজনৈতিক আলোচনায় যে মানুষটিকে শুধু ‘মুসলিম’ পরিচয়ে দেখা হয়, তার সঙ্গে একই ক্লাসে বসা, একই ডাইনিং হলে খাওয়া কিংবা একই ঘরে থাকা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
বাংলাদেশকে নিয়েও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি যখন বলতাম বাংলাদেশ থেকে এসেছি, দেখতাম অনেকেই ভারতকে চেনেন, কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। কেউ কেউ জানতে চাইতেন, এটি কি ভারতের অংশ। কখনো আফগানিস্তানের কথাও উঠত, কারণ বাংলাদেশ আর আফগানিস্তান দুটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। তখন বুঝেছি, দূর থেকে দেখা ভূগোল কত সহজে এক হয়ে যেতে পারে। লা ক্রস থেকে মিলওয়াকি, রচেস্টার, মিনেসোটার বিভিন্ন জায়গা, শিকাগো ঘুরেছি। পরে লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কেও গেছি। নিউইয়র্কে গিয়ে দাঁড়িয়েছি গ্রাউন্ড জিরোতে। যে জায়গাটি একসময় টেলিভিশনের পর্দায় ধ্বংস হতে দেখেছিলাম, বহু বছর পর সেটিই তখন স্মৃতিসৌধ, পর্যটনস্থল, এবং একটি দেশের জাতীয় ট্রমার প্রতীক।
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সিনেমার ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে পরে আমার কাছে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: ৯/১১ মার্কিন সিনেমাকে কীভাবে বদলে দিয়েছিল? সিনেমা তো শুধু ইতিহাসকে ধারণ করে না, ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্কও তৈরি করে। পরিচালক ঠিক করেন আমরা কার মুখ কাছ থেকে দেখব, কার ঘরে ঢুকব, কার ভয় বুঝব, কার যন্ত্রণা অনুভব করব, আর কে শুধু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শত্রু হিসেবেই থেকে যাবে। এই জায়গা থেকেই গত ২৫ বছরের আমেরিকান সিনেমার দিকে তাকালে একধরনের পরিবর্তিত ভাষা চোখে পড়ে।
তবে একটি ভুল ধারণা আগে পরিষ্কার করা দরকার। ৯/১১-এর পর থেকেই হলিউড মুসলমান বা আরবদের ভিলেন হিসেবে দেখাতে শুরু করেছে, ব্যাপারটি এমন নয়। Black Sunday (1977), True Lies (1994), Executive Decision (1996)-এর মতো চলচ্চিত্রে আরব বা মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। আরও পুরোনো হলিউডেও আরবদের কখনো ধর্মান্ধ, কখনো তেলসমৃদ্ধ শেখ, কখনো রহস্যময় বহিরাগত, আবার কখনো সহিংস হুমকি হিসেবে দেখানোর প্রবণতা ছিল। ৯/১১ নতুন করে এই ভাষা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু এর পর এই ভাষার রাজনৈতিক ও আবেগগত গুরুত্ব একেবারেই বদলে যায়। সন্ত্রাসবাদ তখন আর কেবল থ্রিলার সিনেমার প্লট তৈরির উপাদান নয়, তা হয়ে ওঠে আমেরিকার নিজের অভিজ্ঞতার অংশ।

এই পরিবর্তনের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় হলিউডে একধরনের অস্বস্তি দেখা যায়। Spider-Man (2002)-এর সেই পরিচিত টিজার, যেখানে টুইন টাওয়ারের মাঝখানে বিশাল জালে একটি হেলিকপ্টার আটকে যায়, সরিয়ে নেওয়া হয়। Lilo & Stitch (2002)-এর একটি দৃশ্যও বদলে দেওয়া হয়, যেখানে একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ শহরের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে স্পাইক লির 25th Hour (2002) ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। তিনি নিউইয়র্কের ক্ষতটাকে ছবির বাইরে রাখেননি। গ্রাউন্ড জিরো এবং ৯/১১-পরবর্তী শহরের বিষণ্নতাকে গল্পের ভেতরে নিয়ে এসেছেন। এরপর মাইকেল মুরের Fahrenheit 9/11 (2004) সরাসরি প্রশ্ন তোলে বুশ প্রশাসন, ইরাক যুদ্ধ এবং ‘ওয়ার অন টেরর’-এর রাজনৈতিক যুক্তি নিয়ে। অর্থাৎ ৯/১১ নিয়ে মার্কিন সিনেমা কোনো একক ভাষায় কথা বলেনি।
এরপর আফগানিস্তান আমেরিকান সিনেমার পরিচিত ভূগোল হয়ে উঠতে থাকে। 12 Strong (2018)-এ ৯/১১-এর পর মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের প্রথম দিকের আফগান অভিযানের গল্প প্রায় বীরত্বের ‘অরিজিন স্টোরি’র মতো করে বলা হয়েছে। অন্যদিকে Lone Survivor (2013)-এ মূল জায়গা নেয় বন্ধুত্ব, আত্মত্যাগ এবং বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু একই ছবিতে আমরা দেখি, আফগান গ্রামবাসীরা মার্কাস লাট্রেলকে তালেবানের হাত থেকে রক্ষা করছে। ফলে আফগানিস্তান আর শুধু শত্রুর ভূখণ্ড নয়। একই দেশের ভেতরে শত্রু আছে, আবার এমন মানুষও আছে যারা একজন আমেরিকান সৈনিককে বাঁচাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে।
আমার কাছে জিম শেরিডানের Brothers (2009) এই সময়টাকে বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। টোবি ম্যাগুয়ারের চরিত্রটি আফগানিস্তানে বন্দিদশার পর দেশে ফিরে আসে, কিন্তু আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তার স্ত্রী, সন্তান, ভাই, সবাই এমন এক যুদ্ধের প্রভাব বহন করতে শুরু করে যেখানে তারা কেউ যায়নি। এই ছবিতে আফগানিস্তান যেন সৈনিকটির সঙ্গে আমেরিকার ঘরে ফিরে আসে। যুদ্ধ ঢুকে পড়ে দাম্পত্যে, পিতৃত্বে, সন্দেহে, অপরাধবোধে এবং নীরবতায়। ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন সৈনিক তখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বীর নয়, নিজের পরিবারের মধ্যে ফিরে এসে ভেঙে পড়া একজন মানুষও।
ক্যাথরিন বিগেলোর Zero Dark Thirty (2012) যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে আমাদের নিয়ে যায় গোয়েন্দা তৎপরতার ভেতরে। ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার দীর্ঘ অভিযানের সঙ্গে আসে গোপন বন্দিশালা, নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতন। ছবির নির্যাতনের দৃশ্য নিয়ে বড় বিতর্ক হয়েছিল, বিশেষ করে এগুলো কি এমন ধারণা তৈরি করে যে নির্যাতনের মাধ্যমেই বিন লাদেনকে খুঁজে পাওয়ার মতো তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিনেমার স্মৃতি তৈরির ক্ষমতা। সাধারণ দর্শক কোনোদিন সিআইএর গোপন বন্দিশালায় যাবে না। তারপরও একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্যই হয়তো তার মনে সেই অদেখা জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী ছবি হয়ে থেকে যাবে।
American Sniper (2014) আফগানিস্তান নয়, ইরাক যুদ্ধের গল্প। কিন্তু এখানেও একটি বিষয় স্পষ্ট। ক্রিস কাইলের পরিবার আছে, ভয় আছে, স্মৃতি আছে, মানসিক ক্ষত আছে। দর্শক তাকে একজন মানুষ হিসেবে খুব কাছ থেকে চিনতে পারে। অন্যদিকে অনেক ইরাকি চরিত্র থেকে যায় তার বন্দুকের নিশানায় থাকা সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে। পরে War Machine (2017) আফগান যুদ্ধকে ব্যঙ্গের চোখে দেখতে শুরু করে, যেখানে যুদ্ধের লক্ষ্য আর সামরিক প্রতিষ্ঠানের আত্মবিশ্বাসের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। The Outpost (2020)-এ বড় ভূরাজনৈতিক ব্যাখ্যাগুলো অনেকটাই সরে যায়। সেখানে মূলত দেখা যায়, একদল সৈনিক কীভাবে একে অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বীরত্ব আছে, কিন্তু যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে আগের সেই নিশ্চয়তা আর নেই।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর Guy Ritchie’s The Covenant (2023) পরিচিত সম্পর্কটাকে আবার অন্যভাবে সাজায়। এখানে আফগান দোভাষী আহমেদ একজন মার্কিন সার্জেন্টের জীবন বাঁচায়। পরে সেই মার্কিন সৈনিকই আবার আফগানিস্তানে ফিরে আসে আহমেদ ও তার পরিবারকে উদ্ধার করতে। আমার কাছে এই বদলটা তাৎপর্যপূর্ণ। আফগান চরিত্র আর শুধু এমন কেউ নয় যাকে আমেরিকা গিয়ে বাঁচাবে, প্রশিক্ষণ দেবে বা নিজের কাজে ব্যবহার করবে। এখানে সে প্রথমে একজন আমেরিকানের জীবন বাঁচায়। অর্থাৎ নৈতিক দায়ের দিকটাও বদলে যায়।
এই ২৫ বছরের সিনেমার ইতিহাসকে তাই শুধু কে মুসলমানকে ভালো দেখিয়েছে আর কে খারাপ দেখিয়েছে, সেই হিসাবে বিচার করলে পুরো বিষয়টা ধরা যাবে না। হলিউড সবসময়ই তার সময়ের রাজনৈতিক ভয় ও উদ্বেগকে গল্পে জায়গা দিয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ভিলেনের বড় উৎস। পরে আবার রাশিয়া ফিরে এসেছে। কখনো উত্তর কোরিয়া, কখনো ইরান, কখনো সন্ত্রাসবাদ। সুপারহিরো বা ফ্যান্টাসি ছবিতে এই ভয়কে এলিয়েন, রোবট, গোপন সংগঠন বা অন্য গ্রহের শত্রুর শরীর দেওয়া যায়। কিন্তু রাজনৈতিক কিংবা গুপ্তচর সিনেমায় শত্রুর প্রায়ই একটি দেশ থাকে, একটি জাতীয়তা থাকে, একটি ধর্ম থাকে, একটি মানচিত্র থাকে। আর দর্শকের মনে সেই পরিচয় সম্পর্কে আগে থেকেই কিছু ধারণা তৈরি থাকে। সিনেমা তখন শুধু ভয় দেখায় না, ভয়কে একটি মুখও দিয়ে দেয়।
হয়তো এই বিষয়টি আমাকে এতটা ভাবায় কারণ ৯/১১-পরবর্তী আমেরিকার সঙ্গে আমার নিজের পরিচয় হয়েছিল বড় রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে, সাধারণ মানুষের মধ্যে। মুসলমানদের আমি বন্ধু, সহপাঠী ও পরিচিত মানুষ হিসেবে দেখেছি। আমেরিকানদেরও কোনো একক রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে নয়, রুমমেট, শিক্ষক, ছাত্র, পরিবার কিংবা পথে দেখা সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখেছি। ইসলামোফোবিয়া, আরব ও মুসলমানের উপস্থাপন, ‘ওয়ার অন টেরর’ এবং ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন সিনেমা নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে। তারপরও ২৫ বছর পর আমার কাছে প্রশ্নটি রয়ে গেছে: সিনেমা কীভাবে একটি ভূরাজনৈতিক ভয়কে মানুষের মুখ দেয়, আর রাজনীতি বদলে গেলে সেই মুখও কীভাবে বদলে যায়? বাংলাদেশে কিশোর বয়সে টেলিভিশনের পর্দায় টুইন টাওয়ার ধসে পড়তে দেখা থেকে শুরু করে, কয়েক বছর পর একজন ছাত্র হিসেবে আমেরিকায় থাকা, এবং আরও পরে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক হিসেবে এসব সিনেমার দিকে ফিরে তাকানো, প্রশ্নটির উত্তর আমার কাছে সহজ করেনি। বরং মনে হয়েছে, এই প্রশ্নের ভেতরেই আরও বড় একটি গবেষণার জায়গা আছে।
আবু শাহেদ ইমন (চলচ্চিত্র নির্মাতা)


