চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুল হক ডনের আচরণ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে সিআইডি।
পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার ডনকে ঢাকার আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান। আবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম।
আদালতে দেওয়া আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আশরাফুল হক ডন ছিলেন সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি সালমান শাহর সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
মামলার এজাহারে থাকা পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন তাদের চেনেন বলে স্বীকার করলেও মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করছেন বলে অভিযোগ তদন্ত কর্মকর্তার। সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরার কারণে ঘটনার বিষয়ে ডন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন বলে মনে করছে সিআইডি।
আবেদনে আরও বলা হয়, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা ও মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন অত্যন্ত কৌশলীভাবে উত্তর দেন। তার আচার-আচরণ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় পাওয়া তথ্যগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। ডন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে এসআই শাহ আলম বলেন, ‘আসামির পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।’
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার, এরপর রিমান্ড
গত ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর গত ২০ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ২৭ আগস্ট রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দীর্ঘদিনের রহস্য সালমান শাহর মৃত্যু
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মৃত্যু নিয়ে শুরু থেকেই রহস্য ও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি বিষয়টি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
সিআইডির ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমানের বাবা। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক সেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
এরপর সালমান শাহর বাবা মারা গেলে তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজি দেন এবং ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহের কথা জানান।
তদন্ত করেছে র্যাব ও পিবিআই
পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে তদন্ত বন্ধের নির্দেশ দেন।
এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি বিশ্লেষণ এবং জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তবে ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি সালমান শাহর মা। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তিনি আরও তদন্তের দাবি জানান।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেন।
পরে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন এর শুনানি হয়নি।
নতুন করে হত্যা মামলা
গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
আদালত সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে হত্যা করা হয়েছে–এমন অভিযোগে এজাহার দায়ের করেন তার মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম।


