পল্লবীতে বস্তাবন্দির ‘অপহরণ নাটক’, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার

পল্লবীতে বস্তাবন্দির ‘অপহরণ নাটক’, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর পল্লবীতে সাদা বস্তায় করে নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে (৫০) নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রকৃত অপহরণের কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তদন্তে পুলিশ বলছে, পারিবারিক ও আর্থিক সংকটের কারণে নজরুল নিজেই আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন। এ জন্য তিনি এক সহযোগীর সহায়তায় অপহরণের নাটক সাজান।

সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় সোমবার সকালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজে অভিযান চালিয়ে নজরুলকে উদ্ধার করেছে পল্লবী থানা–পুলিশ। এ ঘটনায় তার সহযোগী হাসান তারেক ওরফে রিপনকে (২৬) ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মো. মোস্তাক সরকার জানান, নজরুল টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার বেকার কোনা গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। তিনি পল্লবীর এভিনিউ-২, ব্লক-এ এলাকায় দি স্যালভেশন আর্মি যক্ষা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে প্রায় ১৬–১৭ বছর ধরে কাজ করছেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি মেসে থাকা লোকজনের রান্নার কাজও করতেন তিনি।

গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নজরুল নাইট গার্ডের দায়িত্বে যোগ দেন। পরদিন তাকে কর্মস্থলে না পাওয়ায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। পরে একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটেজে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর ভোর পৌনে ৫টার দিকে এক ব্যক্তি সাদা বস্তায় করে নজরুলকে মেইন গেটের সামনে নিয়ে আসছেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর, ভোর পৌনে ৬টা ৪৫ টার দিকে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে বসেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় করে সেখান থেকে চলে যান। ফুটেজে দৃশ্যমান কোনো জোরজবরদস্তি দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন

বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তদন্তে নামে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, নজরুলের দুই স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। দুই পরিবারই টাঙ্গাইলে থাকে। ১৭ হাজার টাকা বেতন থেকে তিনি দুই পরিবারকে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দিতেন। বাকি টাকা থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন।

সম্প্রতি পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নজরুল আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন বলে পুলিশকে জানান তার স্ত্রী। পরে আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়ে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকতে আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন তিনি।

পুলিশের ভাষ্য, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মেসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রিপনের সহযোগিতা নেন নজরুল। ঘটনার দিন ভোরে রিপন একটি সাদা বস্তায় নজরুলের কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে গার্ড রুমে প্রবেশ করেন। পরে নজরুল নিজেই ওই বস্তার মধ্যে ঢোকেন। রিপন তাকে বস্তাসহ মেইন গেটের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে তারা অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান।

পরে গাবতলী থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাসে চট্টগ্রামের একে খান এলাকায় যান নজরুল। সেখানে ‘রাসেল’ নামের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্ণফুলীর ইছানগর এলাকায় তার বাসায় অবস্থান করেন। পরে রাসেলের মাধ্যমে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজে বাবুর্চির কাজ নেন। সেখান থেকেই সোমবার সকালে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ।

তদন্তে নজরুলের আর্থিক সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ এবং সুদের টাকা মিলিয়ে তার প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা দেনা রয়েছে। কিছুদিন আগে দ্বিতীয় ঘরের মেয়ের বিয়ের জন্যও ঋণ করেছিলেন তিনি। তার ছেলে রিফাত পুলিশকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার বাবা একটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

ডিসি বলন, দুই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের বিয়ে এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে ছিলেন নজরুল।

তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নজরুলের ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত আত্মগোপন এবং কথিত অপহরণ নাটক বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলছে। এ ধরনের নিখোঁজ বা কথিত অপহরণের ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পাশাপাশি যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রচার না করতে সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর