হামের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় রোববার থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। আসন্ন ঈদুল আহজার আগে, আগামী ২১ মের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, ‘রোববার সকাল ৯টা থেকে একযোগে নির্ধারিত উপজেলাগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে।’
শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে হাম টিকাদান কার্যক্রমের প্রস্তুতি বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।’
রোগের পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে ধীরে ধীরে এই কর্মসূচি সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পাঁচটি স্থানে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন এবং অন্য উপজেলায় স্থানীয় সিভিল সার্জনরা দায়িত্ব পালন করবেন।’
তিনি জানান, নবাবগঞ্জে তিনি নিজে উদ্বোধন করবেন, কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পাবনা সদরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, ঝালকাঠির নলছিটিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং গাজীপুরে স্বাস্থ্য সচিব টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
‘আমাদের লক্ষ্য হলো ২১ মের মধ্যে, আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করা। এই সমন্বিত উদ্বোধন সরকারের সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন’, যোগ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান শুরু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নিটাগ) এবং অন্যান্য এক্সপার্টরা আইডেন্টিফাই করেছেন। ১৮টা জেলার অধীনে ৩০টা উপজেলাকে কর্মসূচির আওতায় আনতে যাচ্ছি।’
কর্মসূচির আওতায় থাকা জেলাগুলো হলো- বরগুনা, পাবনা, চাঁদপুর, কক্সবাজার, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বরিশাল, নওগাঁ, যশোর, নাটোর, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, ঢাকা, ঝালকাঠি ও শরীয়তপুর।
৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বর বা অন্য কোনো অসুস্থতা থাকলে সেই শিশুদের আপাতত টিকা দেওয়া হবে না।’
প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও তা পরিবর্তন করে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যত রোগী ভর্তি হয়েছে তার মধ্যে ৮২ শতাংশ রোগী ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের নিচে। সেই কারণে আমরা ফাস্ট কনসিডারেশন নিয়েছি ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস পর্যন্ত।’
‘এই গ্রুপটাকে আমরা কালকে থেকে শুরু করতে এটাকে আমরা ফাস্ট কাভার করতে চাচ্ছি। এই বয়সীরা আগে টিকা পেলেও তাদের আবার দেওয়া হবে। এই টিকা একাধিকবার দিলেও কোনো ক্ষতি হয় না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই,’ যোগ করেন তিনি।

হাম আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা আক্রান্ত হয়েছে কিংবা হাম আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাদের ভিটামিন এ খাওয়ানো হবে। যারা সুস্থ তাদের দেওয়া হবে না। অসুস্থ না কিন্তু আমরা হামের টিকা দিচ্ছি তাদেরও এই ধাপে ভিটামিন এ দেওয়া হবে না।’
বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা দয়া করে জাতিকে একটা মেসেজ দিবেন। জাতি যেন আতঙ্কিত না হয়, আমরা মৃত্যু হার কমিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
‘আমাদের চিকিৎসকরা যেভাবে পরিশ্রম করছেন, তারা এখন মৃত্যুর ভয়ে নেই, মানুষকে বাঁচানোর জন্য কাজ করছেন’, বলেন সাখাওয়াত হোসেন।
শিশু হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, আমাদের যে আইসিইউ ক্যাপাসিটি আছে সেটা ভরে গিয়েছে। যদি কারো আইসিইউ প্রয়োজন হয় তবে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য বসে আছি।’
২০২৫ সালে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন কাজ করতে চাই। অতীতের তদন্ত করে কাউকে ফাঁসি দিয়ে এখন আমাদের লাভ নেই। আমার আগে মানুষকে বাঁচাতে হবে।’
এই কর্মসূচি একটি জরুরি উদ্যোগ হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা নিয়মিত কার্যক্রমে রূপ দেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে এরইমধ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা জোরদার, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


