জাতীয় বাজেট কী, সেখানে কী ঘোষণা আসে-এসবের বিস্তারিত হয়তো জানেন না চট্টগ্রামের বেশির ভাগ রিকশাচালক বা খেটে খাওয়া মানুষ। অর্থনীতির জটিল হিসাবও তাদের বোঝার কথা নয়। কিন্তু বাজেট এলেই যে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, সেই অভিজ্ঞতা তাদের বহু বছরের। তাই বাজেট সামনে এলেই তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করে-আবার কী কী জিনিসের দাম বাড়বে?
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় রিকশাচালক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন বাস্তবতা। তাদের ভাষায়, বাজেটের পর সাধারণত নিত্যপণ্য, বাসাভাড়া, রিকশার যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার প্রায় সব খরচই বেড়ে যায়। কিন্তু সেই তুলনায় আয় বাড়ে না।
নোয়াখালীর হাতিয়ার বাসিন্দা বেলাল কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামে রিকশা চালান। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে নগরে এসে বসবাস করছেন। বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অত কিছু বুঝি না। কিন্তু বাজেট আইলে বাজারে আগুন লাগে, এইটা বুঝি।’
বেলাল বলেন, কয়েকদিন আগেই তার বাসাভাড়া ৫০০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে, রিকশার যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে কয়েক দফায়। আগে যে বেয়ারিং কভার ৭০-৮০ টাকায় কিনতেন, এখন সেটি ১২০ টাকা। রিকশার মালিকেরা দৈনিক জমাও বাড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ে, কিন্তু আমাদের ইনকাম তো আর বাড়ে না। আগে কম ড্রাইভার ছিল, এখন গ্রামের মানুষও শহরে এসে রিকশা চালায়। যাত্রী বাড়ে নাই, চালক বাড়ছে। তাই আয়ও ভাগ হয়ে গেছে।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার আরেক রিকশাচালকও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রামে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। বাজেট নিয়ে তার ধারণা সহজ ভাষায়-‘বাজেট মানে জিনিসের দাম বাড়া।’
তিনি বলেন, ‘মালিককে ১২০ টাকা পর্যন্ত জমা দিয়ে রিকশা চালাই। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ৫০০-৭০০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন।’
দ্রব্যমূল্য বাড়লে আয় বাড়ে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যাত্রী কি বাড়ে? মানুষ কি বেশি ভাড়া দেয়? উল্টো অনেক সময় ভাড়া নিয়ে ঝগড়া হয়। তাই বাজারের দাম বাড়লেও আমাদের আয় বাড়ে না।’
রিকশাচালকদের ভাষায়, বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, ডিম-সবকিছুর দাম বাড়ছে। অনেক পরিবার এখন নিয়মিত মাছ বা মাংস কিনতে পারে না। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন রিকশাচালক বলেন, ‘গরুর মাংস এখন আমাদের স্বপ্ন। কোরবানির সময় মানুষ দিলে তখন খাই। কোরবানির দিন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কয়েক টুকরো মাংস পাই, ওটাই আমাদের কোরবানি।’
শুধু রিকশাচালক নন, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সংকটের কথা বলছেন। নগরের দুই নম্বর গেট এলাকার এক শ্রমিক বলেন, ‘দিন শেষে বাজার করতে গেলেই ভয় লাগে। একদিনের আয় একবেলার বাজারেই শেষ হয়ে যায়।’
খেটে খাওয়া মানুষের প্রত্যাশা, এবারের বাজেটে যেন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তারা চান রিকশার যন্ত্রাংশ বা শ্রমজীবী মানুষের ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় পণ্যে নতুন করে কর বা শুল্ক না বাড়ানো হোক।
বেলালের কণ্ঠে সেই প্রত্যাশা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমরা বেশি কিছু চাই না। চাল-ডাল, তেল, সবজির দাম একটু কম থাকলে শান্তিতে চলতে পারতাম। দিন শেষে পরিবারের মুখে খাবার তুলতে পারলেই আমাদের জন্য সেটাই বড় কথা।’


