আগ্রহটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সুযোগ। হয়তো আমার ভাগ্যে দুটোই মিলে গিয়েছিল, তাই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে রোবোটিক্স নিয়ে কাজ শুরু করলেও এখন একজন শিক্ষক হিসেবে নতুনদের পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ক (মেন্টর) হিসেবে কাজ করছি। একটা সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট নির্মাণ করতে পারাটা ছিল আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো বিষয়, কিন্তু সেই ধাপ পেরিয়ে এখন আমরা নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তি-নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করছি।
যখন এই লেখাটি লিখছি, আমি তখন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) একটি দল নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি প্রতিযোগিতা শেষ করে সরাসরি এখানে চলে এসেছি। তবে এবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দল নয়, বরং খুব ব্যতিক্রমীভাবে দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি দলকে নিয়ে আন্তর্জাতিক ‘রোবোসাব ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি আমরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্সে’র একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা এটি।
‘প্রজেক্ট পসাইডনস কোড’ নামের এই নতুন দলটি প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হয়েছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এই দলের অধিকাংশ সদস্যই ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও দেশের জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন স্কুলের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও আছে দলটিতে।
আমি নিজে একসময় ইউআইইউ-এর শিক্ষার্থী ছিলাম, এখন সেখানেই শিক্ষকতা করছি। একইসঙ্গে ইউআইইউ-এর সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্সে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া নিয়েও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। এর মধ্যেও স্কুল-কলেজের এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হলো কীভাবে–এই প্রশ্নটা হয়তো অনেকের মাথায় ঘুরছে।
সেই প্রসঙ্গে বলতে গেলে আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন, গত জুন মাসে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৬’-এ বিশ্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। একই সঙ্গে টানা ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পঞ্চমবারের মতো এশিয়ার সেরা দল হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউআইইউ-এর এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অনেক আগ্রহী শিক্ষার্থী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। এরই একপর্যায়ে ইউআইইউ কর্তৃপক্ষই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আমাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।
সেই সুবাদেই আমাদের কাছে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক দল দীর্ঘদিন ধরেই পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিতে আসে। এই দলটিও একইভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরবর্তীতে তাদের আগ্রহ, শেখার মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য দেখে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি।
জাতীয় ‘রোবোটিক্স ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠুক
ইউআইইউতে সেন্টার ফর এআই অ্যান্ড রোবোটিকস (সিএআইআর) প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের রোবোটিক্স গবেষণা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করা। কারণ উন্নত রোবোটিক্স নিয়ে কাজ করা অনেক ব্যয়বহুল, যা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই আমরা চেষ্টা করছি আমাদের জ্ঞান, গবেষণা, ল্যাব সুবিধা ও অভিজ্ঞতা দেশের সম্ভাবনাময় দলগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে।
গত প্রায় তিন বছর ধরে আমরা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক দলকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছি। সেই ধারাবাহিকতায় স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের এই দলটির সঙ্গেও আমরা গত প্রায় এক বছর ধরে নিবিড়ভাবে কাজ করছি।
আমাদের এই কার্যক্রম কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়। যতদিন সম্ভব, আমরা দেশের তরুণদের জন্য এই পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই। আমাদের লক্ষ্য একটি দল তৈরি করা নয়, বরং একটি শক্তিশালী জাতীয় ‘রোবোটিক্স ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা।
শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নয়, আমরা চাই এই কিশোর-দলটি দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ‘প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে উঠুক।
আগামী বছরগুলোতে আরও উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, উন্নত সেন্সিং এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে সক্ষম ‘রোবোটিক সিস্টেম’ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদেরও এই ধারায় যুক্ত করা হবে, যাতে ধারাবাহিকভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়।
অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুধু একটি রোবট বানানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে গবেষণা, ডিজাইন, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, ডকুমেন্টেশন, পরীক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, ভিসা, লজিস্টিকস এবং পুরো টিমকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত করা।
স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের এই দলটিকে প্রতিযোগিতা পর্যন্ত নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থায়ন। অধিকাংশ ব্যয়ই দল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব অর্থায়নে বহন করতে হয়েছে। আমাদের ‘সেন্টার ফর এআই অ্যান্ড রোবোটিকস’ ল্যাবরেটরি থেকেও গবেষণা সুবিধা, ল্যাব স্পেস, বিভিন্ন টুলস, যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় কিছু কম্পোনেন্ট দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে উৎসাহ ও শুভকামনা পেয়েছি, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এখন পর্যন্ত এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা পাইনি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ভবিষ্যতে যদি এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের আরও অনেক তরুণ বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অংশ নিলে বিশ্বের সেরা গবেষক, প্রকৌশলী এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়, নিজেদের প্রযুক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো ভবিষ্যতে দেশের গবেষণা, শিল্প এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য মাইলফলক
স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের তৈরি পানির নিচে চলাচলযোগ্য যে রোবোটটি এবারের ‘রোবোসাব ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে, সেটি বাস্তব পরিবেশে জটিল সমস্যা সমাধানের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়েছে।
রোবটটিতে রয়েছে উন্নত সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, রিয়েল-টাইম পরিবেশ বিশ্লেষণ এবং মডুলার ডিজাইন। ফলে এটি কঠিন পরিবেশেও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বাস্তব প্রয়োগেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে, উদ্ভাবন করতে পারে এবং ভালো ফলাফল করতে পারে, সেটি এখন প্রমাণিত। এই কারণে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে ধৈর্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দলগত কাজ এবং নিয়মিত গবেষণার বিকল্প নেই।
নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স, এআই ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিযোগিতাকে জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া হোক। গবেষণাগার, প্রোটোটাইপ তৈরির অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমর্থন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত এই খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রত্যাশা
আমাদের দেশে মেধার কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু সঠিক সুযোগ, সঠিক পরিবেশ এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ। আমি বিশ্বাস করি, সেই সুযোগ তৈরি করতে পারলে আগামী দশকে বাংলাদেশ থেকেই বিশ্বমানের রোবোটিক্স প্রযুক্তি ও গবেষণা উঠে আসবে।
আমি সবসময় বিশ্বাস করি, কোনো অর্জন কখনো একজন মানুষের একার হয় না, এটি পুরো দলের, শিক্ষার্থীদের, সহকর্মীদের এবং প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
যদি আমার অভিজ্ঞতা বা দিকনির্দেশনা কিছু শিক্ষার্থীকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করে, শিক্ষক হিসেবে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে আমি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের রোবোটিক্স গবেষণা, প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ‘ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলতে কাজ করতে চাই।
- মো. আবিদ হোসাইন প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)


