আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেড়েই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সৌরবিদ্যুতে জোর দিচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে আবার যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এই খাতের বিকাশে বাধা তৈরি করছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে রুফটপ ও ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেমে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক এই খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, বড় আকারের ইউটিলিটি স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আমদানি শুল্কে পূর্ণ ছাড় পেলেও রুফটপ সোলারে ব্যবহৃত ব্যাটারি, ডিসি কেবল, মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে উচ্চ শুল্ক বহাল থাকায় ছাদভিত্তিক সোলার স্থাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ওপর কার্যকর আমদানি শুল্ক ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারে ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, সোলার চার্জ কন্ট্রোলারে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও ডিসি কেবলে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে।
সোলার যন্ত্রপাতি আমদানিকারক এইচএনবিসি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সরকার সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রে কিছু সহায়তা দিলেও পুরো সিস্টেম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অন্যান্য যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের শুল্ক বহাল রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সোলার সিস্টেমে শুধু প্যানেল না, ইনভার্টার, কেবলসহ আরও অনেক কম্পোনেন্ট লাগে। প্যানেলের মতো যদি অন্যান্য আইটেমেও ডিউটি কমানো যায়, তাহলে পুরো সিস্টেমটাই মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে।’
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে সোলার প্যানেলের দাম কমে যাওয়ার পরও আমদানির ক্ষেত্রে ওজনভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের কারণে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে।
হাসান মাহমুদ জানান, সরকার কেজি হিসেবে একটা নির্ধারিত মূল্য ধরে ডিউটি ও অন্যান্য চার্জ নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তব বাজারমূল্য অনেক সময় এর চেয়ে কম থাকে। ফলে সোলার সিস্টেমের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি সরকার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে সব সরকারি কার্যালয়ের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত মে মাসে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, এ বিষয়ে সকল জেলার ডিসিদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রত্যেক সরকারি অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের ছাদে ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সোলার প্যানেল প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, গ্রিডভিত্তিক বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শুল্কে পূর্ণ ছাড় পায়। অথচ ছাদভিত্তিক বা ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেমকে উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। এই পার্থক্যের কারণেই বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তুলনামূলকভাবে সহজে এগোলেও রুফটপ সোলার খাত চাপের মধ্যে রয়েছে।
সরকারের ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেও এই শুল্ক কাঠামো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, ‘এক মেগাওয়াট সোলারে সরকার একবার আমদানি শুল্ক পাবে। কিন্তু সেই সোলার তার লাইফ সাইকেলে ২৫ থেকে ৩০ গুণ পর্যন্ত জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করবে।’
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানি কমানোর যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তার তুলনায় বর্তমান শুল্ক থেকে সরকারের স্বল্পমেয়াদি আয় তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে পাঁচ বছরের জন্য শুল্ক ছাড় দিতে পারে। এ সময়ে যদি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি হয়, পরে আবার শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে।
শুল্ক ব্যবস্থার আরেকটি দিক ওজনভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ওজন ধরে মাপামাপি বা এই ধরনের আমদানির হিসাব আর দরকার নাই। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুরোপুরি শুল্কছাড় দিলে খাতটা দ্রুত এগুতে পারবে।
ব্যবসায়ীরাও ওজনভিত্তিক শুল্ক নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। গত ২১ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সোলার প্যানেলের দাম প্রতি কেজি প্রায় ১ ডলার হলেও কাস্টমস তা ৩ ডলার হিসেবে মূল্যায়ন করছে। ফলে আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।


