‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি–নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরতে চাই। আমরা আর বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সামনে এভাবেই নিজেদের দীর্ঘদিনের বেদনার কথা তুলে ধরেছেন উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে থাকা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘আপনাদের তো ঘরবাড়ি আছে, আমরা আমাদের ঘরবাড়িকে মিস করছি।’
শুক্রবার উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে সার্জিও গরের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে এ দাবি জানান রোহিঙ্গারা। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিন দিনের সরকারি সফরের দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার দুপুরে প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৌঁছায়। প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও ছিলেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে তারা সরাসরি আশ্রয়শিবিরে যান।
প্রথমে প্রতিনিধি দলটি ৮ নম্বর ক্যাম্পের ওয়াচ টাওয়ার থেকে আশ্রয়শিবিরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পরে আন্তর্জাতিক সেবাদানকারী সংস্থা আইআরসি পরিচালিত হাসপাতাল, ৪ নম্বর ক্যাম্পে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র, ৪ এক্সটেনশন ক্যাম্প এবং ৮-ডব্লিউ ও ৬ নম্বর ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মানবিক কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেন।
রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু কোনো মানুষ চিরকাল নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের আশ্রয়ে থাকতে চায় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আমরা নিরাপদে আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারি।’
আব্দুল ওয়াহাব নামে আরেক রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছি। বছরের পর বছর ক্যাম্পে অবস্থান করলেও আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা নিজ দেশে ফিরে যাওয়া।’
দিনব্যাপী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বিকাল ৫টার দিকে উখিয়া দক্ষিণ স্টেশনের নর্থ এন্ড কফি হাউস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রোহিঙ্গা সংকট, চলমান মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
মতবিনিময় শেষে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মার্কিন বিশেষ দূত বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি সরেজমিনে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্যও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।’
সফর শেষে সন্ধ্যায় প্রতিনিধিদলটি ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করে।


