পৌষ সংক্রান্তির শেষে কুশিয়ারা নদীর পশ্চিম তীরজুড়ে বসেছে দেশের প্রাচীনতম বড় মাছের মেলা। প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী এই মেলা শুধু মাছ কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক জীবনের এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এ মেলা চলে বুধবার পর্যন্ত। মৌলভীবাজার জেলার শেরপুরে কুশিয়ারার তীরে ভোর থেকেই মানুষের ভীড় জমতে শুরু করে। নদী তীরের বিস্তৃত মাঠজুড়ে বসে হাজারো দোকান। মাছের আড়ত আর লোকজ বিনোদনের আয়োজনে জমে ওঠে বড় মাছের এই মেলা। যেখানে মাছের গন্ধ, মানুষের হাঁকডাক, মাইকিং, ঢোলের শব্দ আর শিশুদের উল্লাস মিলেমিশে এক হয়ে যায়। মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মেলাটি মাছের মেলা নামে পরিচিত হলেও এটি এখন একটি সর্বজনীন গ্রামীণ লোকজ উৎসব। মাছের পাশাপাশি এই মেলায় পাওয়া যায় আসবাবপত্র, রান্নাঘরের সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, দেশীয় খাবার, পিঠা-পুলি, নকশীকাঁথা, শীতলপাটি ও কাঠের তৈরি নানা পণ্য।
শিশুদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, চড়কি খেলা, বায়োস্কোপ ও ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন। বিশেষ করে পিঠা খাওয়া আর ঘুড়ি ওড়ানো এই মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

হাওর–নদী পেরিয়ে আসে বিশাল বিশাল মাছ এই মেলায় আনা হয়। আগে স্থানীয় জেলেরা এই মেলায় মাছ আনলেও এখন সারা দেশের নদী–হাওর–খামার থেকে মাছ আসে। সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা নদী, হাকালুকি, কাওয়াদিঘি, হাইল ও টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে বাঘাইড়, রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়, মৃগেলসহ নানা প্রজাতির বিশাল সব মাছ আনা হয় এখানে।
পাইকাররা জানান, এসব মাছ সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয় ছয় মাস আগে থেকেই। বিশেষ আকারের মাছ আলাদা করে লালন করা হয় শুধুমাত্র এই মেলার জন্য।
এখানে ছোট মাছের চাহিদা তুলনামূলক কম। পাঁচ হাজার টাকার নিচে মাছ খুব কমই বিক্রি হয়। মাঝারি আকারের মাছের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, বড় আকারের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
এ বছর মেলায় চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, ১০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাছও দেখা গেছে। সবচেয়ে দামি মাছ হিসেবে কুশিয়ারার বিখ্যাত বাঘাইড় মাছের দাম হাঁকা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি।

অন্যদিকে, এই মেলাকে কেন্দ্র করে শেরপুর, নবিগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বহু প্রবাসী প্রতিবছর দেশে ফেরেন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা আর মেলার আনন্দ, সব মিলিয়ে এটি সামাজিক পুনর্মিলনের উৎসবে রূপ নিয়েছে।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান- সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই মেলাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে।
আয়োজকদের মতে, প্রায় ২০০ বছর আগে সদর উপজেলার সত্রস্বতী পরগনার সাধুহাটি গ্রামের জমিদার রাজেন্দ্রনাথ দাম (মথুর বাবু) নবান্ন ও পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এই মেলার সূচনা করেন। তখন শেরপুর ছিল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। সেই ঐতিহ্য আজও বহমান।
অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এই মেলা। এই মেলার মাধ্যমে কোটি টাকার মাছ ও পণ্যের বাণিজ্য হয়। হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে এটি জড়িত। পাশাপাশি এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও শেরপুরের এই মাছের মেলা প্রমাণ করে, গ্রামীণ লোকজ উৎসবই বাঙালির শিকড় ও প্রাণের শক্তি।


