ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত করেছে সরকার। কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর যখন সফরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত, ঠিক তখনই সরকার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করল।
ঢাকা জানিয়েছে, সফর বাস্তবায়নের আগে একটি ইতিবাচক ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সাবেক কূটনীতিকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শুধু সাক্ষাৎ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এই সফর থেকে দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান ও সুনির্দিষ্ট ফলাফল আসতে হবে। শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফেরানো, নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত উত্তেজনার মতো বড় সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে মেটানো প্রয়োজন।
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিষয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে কথা বলছিলেন। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা দিল্লিতে একটি উন্মুক্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এর ফলে সফরের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়।
মুখপাত্র আরও বলেন, শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতকে ফের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি তুলে ধরে বলেন, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে এবং দেশের সম্মান বজায় রেখেই বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সফর হতে হবে এমন, যা থেকে দুই দেশই লাভবান হয় এবং নির্দিষ্ট একটি ফলাফল পাওয়া যায়।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ভারত ইতিবাচক বার্তার কথা বলছে। তবে এখন তাদের কথা ও কাজে তা প্রমাণ করতে হবে। আসল দায়িত্ব এখন ভারতের ওপরই।’
আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মেহেদী হাসানও সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে জনগণের মতামত অনেক বড় বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সাধারণ মানুষ অত মাথা ঘামায় না। তবে সরকারের সাম্প্রতিক সাহসী বক্তব্যগুলো মানুষ খুব পছন্দ করেছে।
মেহেদী হাসান আরও বলেন, ‘ভারত প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে চেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সুন্দর পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। শেখ হাসিনা এখন দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, আর এই ঝামেলা মিটানোর দায়িত্ব ভারতেরই।’
দুই দেশের সম্পর্কের বড় বাধা
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জটিলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। ঢাকা মনে করে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সুযোগ দেওয়ার কারণেই তিনি ৫ আগস্ট একটি অনলাইন অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নানা কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ তাকে ফেরাতে অনুরোধ করলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ভারত কেবল এটি একটি আইনি বিষয় বলে এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতের কোনো আদালতেই এখনো বিষয়টি তোলা হয়নি।
রাষ্ট্রদূত সালেহ বলেন, বাংলাদেশ আগে থেকে অনুরোধ করার পরও হাসিনাকে বক্তব্য দিতে দেওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি করেছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের মাটিকে ব্যবহার করে হাসিনা বা অন্য কারও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
তিনি বলেন, এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। চুক্তির আওতায় হাসিনাসহ বাকি সব আসামিদের ফেরানোর বিষয়েও ভারতকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মেহেদী হাসান বলেন, সরকার জনগণের নাড়ি বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক স্পষ্ট বক্তব্যগুলোকে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানিয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে তৈরি হওয়া এই জটিলতা ভারতকে উদ্যোগ নিয়েই দ্রুত দূর করতে হবে।


