দেশজুড়ে অব্যাহত লোডশেডিংয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট এলাকায় ফিরে এসেছে দেড় যুগ আগের সেই স্মৃতি। বিদ্যুতের যাওয়া আসায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ এখনো বিক্ষুব্ধ।
এলাকাবাসী বলছেন, দিনে-রাতে কখন বিদ্যুৎ আসে আর কখন চলে যায়, তার কোনো ঠিক নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা–মোদ্দা কথা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই সেখানে ব্যাহত হচ্ছে। রাতের ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় ঘুমের ব্যাঘাতে শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য সমস্যা।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদার দুই তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, আবার কিছু স্থাপনায় সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হয়। এই অবস্থায় লোডশেডিং দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
২০০৬ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে কানসাটবাসী দেখায় নজিরবিহীন প্রতিবাদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সে সময় প্রাণ হারায় ১৯ জন। প্রত্যন্ত এক গ্রাম সারা দেশে হয়ে উঠে তুমুল আলোচিত এক নাম।
তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। আর এই প্রাণহানির ঘটনায় বেকায়দায় পড়ে গোটা সরকারই। রাজনীতিতে বেকায়দায় পড়ে তারা। সারা দেশে বিদ্যুতের দাবিতে এখানে সেখানে শুরু হয় বিক্ষোভ। সেই আন্দোলনের নেতা গোলাম রাব্বানী পরে সংসদ সদস্যও হন।
এরপর টানা বহু বছর কানটাসের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল বেশ ভালো। সেখানে সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগ গুরুত্ব দিয়েছে। এবারের পরিস্থিতি সেই ১৮ বছরের আগের মতোই।
কানসাট ইউনিয়নের প্রবেশপথ বেকির মোড় এলাকায় চা বিক্রেতা সুমন আলী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। অথচ একসময় এ ইউনিয়নের মানুষ লোডশেডিংয়ের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী সেলিম মিয়াও বলেন, ‘বিগত সময়ে বিদ্যুৎ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু এখন কখন বিদ্যুৎ আসবে, কখন চলে যাবে–তার কোনো ঠিক নেই। বিশেষ করে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমানোরও সুযোগ থাকে না।’
কানসাট আন্দোলনের নেতা গোলাম রাব্বানীর বাড়িতে এখন সুনশান নীরবতা। সেই আন্দোলনের পর তিনি গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে নবম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও জিততে পারেননি। পরে ২০১৩ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের দিনই রাব্বানীর বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে বাড়িটি পরিত্যক্তর মতোই।
ওই আসনে নবম সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৩ সালের পর প্রথমবারের মতো জয় পায় আওয়ামী লীগ। দলের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক হন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীও।
বাড়িটির পাশের মুদি দোকানি সোহেল রানা বলেন, ‘বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও গোলাম রাব্বানীর সময়–প্রায় সব সময়ই এ এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো ছিল। কিন্তু এবার আর সেই কানসাটের মতো গুরুত্ব নেই।’
সেই বাড়ি পেরিয়ে যাওয়া হয় কানসাট উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায়। সন্ধ্যার পর স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনায় উঠল সেই বিদ্যুতের দুর্ভোগের কথাই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কানসাট জোনাল অফিসের সামনে থাকা মুদি দোকানি হাসান আলী বলেন, ‘দুই থেকে আড়াই বছর ধরেই এখানে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হয়।’
কানসাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল হাদি বলে, ‘বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতেও পড়ালেখা করতে সমস্যা হচ্ছে।’
গোলাম রাব্বানীতে পাওয়া না গেলেও কানসাট আন্দোলনের আরেক নেতা ও সে সময় গ্রেপ্তার হওয়া জহির হাসান চৌধুরীর বক্তব্য পেয়েছে টাইমস। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের পর কেবল কানসাট না, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও ভালো ছিল বহু বছর।’
‘মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে আবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে’, সতর্ক করেন তিনি।।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক ফজলুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘রাতে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৪ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’


