আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার আগেই সারা দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও তোপের মুখে পড়েছে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। মাঠপর্যায়ে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও সংঘর্ষের কারণে এ কর্মসূচি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অনিয়মের নানা অভিযোগ ওঠায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। দেশের প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে এই প্রকল্পের অধীনে নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অনেক জায়গায় সরকারি দপ্তর এবং স্থানীয় বিএনপি অফিসে তালা ঝোলানো হয়েছে। পছন্দের প্রার্থীরা নিয়োগ না পাওয়ায় বিএনপির বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীও আন্দোলনে নেমেছে।
সরকারের মূল পরিকল্পনা হলো–আগামী চার বছরে পর্যায়ক্রমে ১ কোটি ৬০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা। এজন্য পরিবারের তথ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
রোববার কিশোরগঞ্জ সদরের লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এই কার্যক্রমের সূচনা হয়। আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে এটি সম্প্রসারিত হওয়ার কথা।
তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ তালিকা ও টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সংগৃহীত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একাধিক জেলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাদের স্বজনরা পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ ও বিবাদের কারণে অনেক এলাকায় ফল প্রকাশ আটকে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম সদরে নিয়োগ পাওয়াদের তালিকায় রয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কাজী মঞ্জু মিয়ার স্ত্রী নাঈমা আক্তার, সাবেক আহ্বায়ক এস এম জাবেদের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার, উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি ইউনুস আলীর ছেলে রিপন মিয়া এবং ছাত্রদল নেতা তাকবীর আহমেদ।
একই জেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি শওকত মিয়ার ছেলে তামিম মিয়া, আদামপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাঈম হোসেন এবং ছাত্রদলের সাবেক সদস্য বায়েজিদ বোস্তামীও নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ইটনা উপজেলার মৃগা ইউনিয়নে কয়েকজন যুবদল ও জাসাস নেতা এবং স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাদের স্ত্রীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ক্ষুব্ধ ছাত্রদল কর্মীরা বিএনপির কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের কুরুলগাছি অফিস তালাবদ্ধ করে দেন। তাদের অভিযোগ, দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের বাদ দিয়ে অনিয়ম ও লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
পাশের জীবননগরেও অধিকাংশ পদে বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠনের লোকদের নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে পরীক্ষায় পাস করা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
ফেনীতে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বিক্ষোভ করেছে বিএনপির একটি অংশ। দলটির স্থানীয় নেতাদের দাবি, ফেনী-২ আসনের এমপি জয়নাল আবেদীনের পাঠানো তালিকা থেকেই নিয়োগ হয়েছে। ফলে দলের ত্যাগী কর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন, এমনকি কয়েকজন আওয়ামী লীগ সমর্থকও নিয়োগ পেয়েছেন।
গত ১৩ আগস্ট ফেনী সদর ইউএনও’র কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে ওই তালিকা বাতিলের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। তবে ফেনী সদরের ইউএনও সুলতানা নাসরিন কান্তা জানান, সব নিয়ম মেনে পরীক্ষার মাধ্যমেই নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
একইভাবে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন যুবদল ও ছাত্রদল কর্মীরা। অনিয়মের প্রতিবাদে রাজশাহীর বাগমারাতেও মানববন্ধন হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বিএনপির নির্দেশিত তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ না হওয়ায় গত সোমবার ইউএনও’র কার্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।
পরবর্তীতে নাচোল উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শফিকুল ইসলামের একটি বক্তব্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। ইউএনও’কে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কথার বাইরে চললে এই অফিসে এক ঘণ্টাও চাকরি করতে পারবেন না। আপনার মতো বহু ইউএনও’কে অফিস থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা বিএনপি রাখে।’
রংপুরের পীরগঞ্জে উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি ও ইউএনও’র উত্তপ্ত ফোনালাপের অডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। ছাত্রদল নেতা মোস্তাফিজুর রহমান জানতে চান–কেন আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সমর্থকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জবাবে ইউএনও বলেন, তিনি দল দেখে কাউকে নিয়োগ দেননি। পরীক্ষার ফল ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার বুড়িচংয়ে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগের অভিযোগ তুলে ইউএনও তানভীর হোসেনের অপসারণ দাবি করেছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মনির।
সেখানে দেখা গেছে, বাকশিমুল ইউনিয়নের সুপারভাইজার হিসেবে মাহমুদুল হাসান নিলয় এবং ষোলনল ইউনিয়ন থেকে তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক নিয়োগ পেয়েছেন। তবে ইউএনও তানভীর হোসেন জানান, ৬৪৯ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে বাছাই করে ১১৫ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে।
মেহেরপুরের গাংনীতে রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে স্মারকলিপি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। উপজেলা জামায়াতের আমীর রবিউল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলে প্রকৃত দুস্থ মানুষদের সঠিক তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, কার্ড পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নারীদের হয়রানি এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে কেউ বিএনপি করে কি না, তা মোটেও দেখা হচ্ছে না। প্রকৃত সব যোগ্য মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
অতীতে ভাতা পেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যারা পাওয়ার যোগ্য, তারা সবাই এই কার্ড পাবেন।’
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কিশোরগঞ্জের রাকিবুল হাসান রুকেল, কুমিল্লার মাহফুজ নান্টো, মেহেরপুরের আসিফ ইকবাল, চুয়াডাঙ্গার মো. মিথুন, ফেনীর সোলাইমান হাজারী ডালিম এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. সাজেদুল হক।)


