‘দাদা, পানি দাও, আমি ঘটনা ঘটাই ফেলছি’

‘দাদা, পানি দাও, আমি ঘটনা ঘটাই ফেলছি’
নিহত গণপতি ও তার পরিবার। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

‘আমি তখন ওকে বলছি, তুই কী করে আসলি এদিকে? তখন (মুগ্ধ) সে বলছে, দাদা, পানি দাও, আমি ঘটনা ঘটাই ফেলছি, আমি তো মার্ডার করছি।’ এই কথা যখন কইছে, তখনো আমি দরজা খুলি নাই। তারপর সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর প্রশাসন এসে মাটি থেকে তোলে, ধরে ফেলে।’

মঙ্গলবার বিকালে কথাগুলো বলেছেন, রংপুর মহানগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানের কর্মচারী (ডোম) বিদ্যুৎ মোহন্ত।

বিদ্যুৎ মোহন্ত বলেন, ‘ওইদিন সে এসে দরজায় ঠকঠক করছিল। জল চাইতেছিল। গেট খুলিনি। প্রথমে জানালা খুলছি। পরে দেখি প্রশাসন আসছে। পরে এসে তাকে নিয়ে গেছে। আমি দরজা পর্যন্ত গেছি। যখন প্রশাসন ওকে নিয়ে যায়, তখন আমি বলছি, তোর তো ফাঁসি হওয়া উচিত। তুই যে কাজটা করছিস, তা মানুষের মানসিকতায় পড়ে না।’

বিদ্যুৎ যার বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানিয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে নামে। প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। সিদ্ধার্থের ভাষ্য অনুযায়ী মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তারের অভিযানে নামলে সে সটকে পড়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।

দেয়াল টপকে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের এসআই আসাদ ও আব্দুল আজিজ টর্চলাইট নিয়ে তাকে ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে সে তুঁতফার্ম এলাকায় লুকানোর চেষ্টা করে। সেখান থেকে পালিয়ে শেষে শ্মশানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে মুগ্ধ। তবে পুলিশ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত তাকে আটক করা হয়।

আটকের সময়ই গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে মুগ্ধ–এমন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। একইভাবে সিদ্ধার্থও তা স্বীকার করেছে।

আরও পড়ুন

এদিকে, গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা ও তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব হয়।

রংপুর মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের ডোমের ভাষ্য, ‘ওই দুজনের শরীর থেকে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করে রেখেছি। তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে।’

তবে ফরেনসিকে অংশ নেওয়া রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, ডোম যা বলেছে তা ঠিক না। কারণ, নমুনা সংগ্রহ করার কথা সেও বলেছে, কিন্তু নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করার পর ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসকের ভাষ্য, ‘আমাদের কাছে যখন ধর্ষণের বিষয়ে মতামত চায়, তখন আমরা যদি কোনো সাইন পাই যা খালি চোখে দেখতে পাই, আর যদি খালি চোখে দেখতে না পাই, তখন আমরা নমুনা রেখে দিই। তারপর মাইক্রোস্কোপিতে পাঠিয়ে দিই। যখন তারা কোনো আলামত পায়, তখন আমরা সেভাবেই রেখে দিই। ওই এভিডেন্সটা রেখে দিই, সেটিও সে (ডোম) বলেছে। কিন্তু পরীক্ষার পর যে রিপোর্ট আমাদের কাছে এসেছে, সেই রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত আমরা পাইনি।’

এদিকে, চিকিৎসকের করা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে এসেছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে–নিহত ব্যক্তিকে গলায় নরম ও নমনীয় কোনো বস্তু দিয়ে চাপ বা ফাঁস দেওয়া হয়েছিল। এতে গলায় গভীর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও টিস্যুর ক্ষতি হয় এবং শ্বাসরোধে মৃত্যু ঘটে। পাশাপাশি বুকে ও মাথায় ভোঁতা আঘাতের চিহ্ন এবং নাকের কার্টিলেজ ভাঙা পাওয়া গেছে। চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামত, এটি মৃত্যুর আগের আঘাত এবং হত্যাজনিত শ্বাসরোধে মৃত্যু। ময়নাতদন্তের সময় থেকে আনুমানিক ২ থেকে ৪ দিন আগে মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, নৃশংস চার হত্যাকাণ্ডের মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিনাত আলী জানিয়েছেন, এটি একটি ক্লুলেস মার্ডার ছিল। অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা পুলিশের কাছে এবং আদালতে একে অপরকে জড়িয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। আরও তদন্ত চলছে, অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রংপুর জিলা স্কুলে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad