জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, নিরাপদ ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তার মতে, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের দক্ষতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে মডেল ফার্মেসি গড়ে তোলা সম্ভব হলে ওষুধজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।
তিনি বলেন, ওষুধ উৎপাদন থেকে শুরু করে রোগীর হাতে সঠিক মাত্রায় মানসম্পন্ন ওষুধ পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ফার্মাসিস্টরা ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই তাদের পেশাগত মর্যাদা, যৌক্তিক অধিকার এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আধুনিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘স্বাস্থ্য খাতে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আতিকুর রহমান রুমন বলেন, একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার দিকনির্দেশনা দিলেও ওষুধের সঠিক প্রয়োগ, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং রোগীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার কারিগরি দায়িত্ব পালন করেন ফার্মাসিস্টরা। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টের পদ সৃষ্টি এবং নিয়মিত নিয়োগ বৃদ্ধি করা জরুরি। তা না হলে সাধারণ মানুষ মানসম্মত ফার্মা-কেয়ার থেকে বঞ্চিত হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার পেশাগত বৈষম্য দূরীকরণ এবং দক্ষতা অনুযায়ী পদায়নের বিষয়ে আন্তরিক। ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের পদোন্নতির সুযোগ, বেতন বৈষম্য নিরসন এবং কাজের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট প্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাদের কর্মক্ষেত্রের নানা সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। বক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যমান অনুযায়ী প্রতি চারজন চিকিৎসকের বিপরীতে অন্তত একজন ফার্মাসিস্ট থাকা প্রয়োজন হলেও দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনো ফার্মাসিস্টের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
সভায় ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নেতারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা চালু করা, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে ওষুধ বিতরণ নিশ্চিত করা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নতুন পদ সৃষ্টি করে দ্রুত নিয়োগ প্রদান, ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন, চাকরির নির্দিষ্ট সময় শেষে পদোন্নতির সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা এবং নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে কাউন্টার সেবা পরিচালনা বাধ্যতামূলক করা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশে জটিল রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির পাশাপাশি ওষুধের অপব্যবহার ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ও ফার্মাসিস্টের নির্দেশনা ছাড়া নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট শুধু ওষুধ বিতরণ করেন না; তিনি রোগীকে ওষুধের সঠিক মাত্রা, সেবনবিধি, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। তাদের দক্ষতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে মডেল ফার্মেসি গড়ে তোলা সম্ভব হলে ওষুধজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে বক্তারা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে একটি সুস্পষ্ট ও কৌশলগত রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে আতিকুর রহমান রুমন বলেন, আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে স্বাস্থ্য খাতকে আরও ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। তিনি বলেন, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টরা নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়মিত হালনাগাদ রাখলে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবেন।
আলোচনা সভায় ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় নেতারা, স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মকর্তা এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভার সুপারিশগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


