সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম দিকের একটি সংজ্ঞায় বলা হয়, খবর হলো এমন কোনো নতুন তথ্য বা ঘটনা যা জনসাধারণের আগ্রহ আকর্ষণ করতে সক্ষম। অর্থাৎ একটি তথ্য তখনই খবর হয়ে ওঠে যখন তা নতুন, প্রাসঙ্গিক এবং মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে।
এই সহজ সংজ্ঞা শুধু সংবাদকে ব্যাখ্যা করে না, বরং বোঝায়–খবর আমাদের মানসিক পরিসর কত সহজে দখল করে নেয়।
আজকের যুগে খবর আর শুধু তথ্য নয়। এটি আমাদের অনুভূতি, চিন্তা, মনোভাব এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা এক শক্তিশালী মানসিক শক্তি। প্রতিদিন স্ক্রিনে স্ক্রল করতে করতে আমরা সামনে পাই দুর্ঘটনা, সহিংসতা, দুর্নীতি, যুদ্ধ, মৃত্যু এবং একটানা নেতিবাচকতার স্রোত।
ফলে একটি প্রশ্ন উঠে আসে, অতিরিক্ত নেতিবাচক খবর কি মানসিক ক্ষতি করে?
সহজ বাংলায় এর উত্তর হলো–হ্যাঁ, করে।
খবর পরিবেশনের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। রেডিও থেকে টেলিভিশন, আর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–প্রতিটি ধাপে খবরের রূপ বদলেছে। আজ সামাজিক প্ল্যাটফর্ম খবরকে এমন এক উন্মুক্ত বাজারে পরিণত করেছে, যেখানে যে কেউ খবর ছড়াতে পারে।
একসময় যে খবরকে ‘এক্সক্লুসিভ’ বলা হতো, এখন তা কয়েক মিনিটের মধ্যে মূল্য হারিয়ে ফেলে। কারণ, প্রতিযোগিতার চাপে কেউ না কেউ সেটিকে আরও দ্রুত, আরও আকর্ষণীয় আকারে ছড়িয়ে দেয়।
এই আকর্ষণ ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় খবরকে অনেক সময় অযথা ভয়াবহ বা উত্তেজনাপূর্ণ করে উপস্থাপন করা হয়। আর এই অ্যালগরিদমনির্ভর বাস্তবতা মানুষের মনকে ক্রমাগত ক্লান্ত, আচ্ছন্ন ও উদ্বিগ্ন করে তোলে।
বর্তমান সাংবাদিকতায় শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং বিশ্লেষণ, যাচাই এবং সত্যকে মানবিক কিন্তু শান্ত ভাষায় উপস্থাপন করার দায়িত্বও রয়েছে। কিন্তু দর্শকের মনস্তত্ত্বকে ধরে রাখার তাড়নায় অনেক সময় খবর হয়ে ওঠে ভয়, অস্থিরতা এবং আতঙ্কের উৎস। সাধারণ পাঠক তখন আটকে পড়েন এক অদৃশ্য মানসিক ক্লান্তির বলয়ে।
খবর কীভাবে সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে লেখা হয়, কীভাবে উপস্থাপন করা হয়–এসব নিয়ে সাংবাদিকতার নিজস্ব পদ্ধতি, কাঠামো ও দায়িত্ব আছে। প্রতিবেদন, মানবিক গল্প, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সাক্ষাৎকার; এগুলোর প্রতিটিরই আলাদা ভূমিকা।
মানবিক গল্প সহমর্মিতা তৈরি করে, আবার অতিরিক্ত মানবিক ট্র্যাজেডি মানসিক ভার বাড়ায়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সমাজকে সচেতন করে, কিন্তু এতে ক্রমাগত অন্ধকার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যা অনেকের মনেই হতাশা সৃষ্টি করে।
খবর পরিবেশনের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়াও। প্রতিদিনের নেতিবাচকতার চাপে মানুষের সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। প্রতিটি মৃত্যু, দুর্ঘটনা বা সংকট আগের মতো দাগ কাটে না। বরং ক্লান্তি, অবসাদ আর উদাসীনতা তৈরি হয়।

তাই প্রশ্ন ওঠে, খবর যদি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে অতিরিক্ত নেতিবাচকতার ওপর নির্ভর করে, তাহলে কি এর মানসিক প্রভাবও সাংবাদিকতার আলোচনায় থাকা উচিত নয়? কারণ, খবর শুধু তথ্য নয়, এটি সেই আয়না যার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে দেখি। আর যদি আয়নাই অন্ধকার হয়, তবে পৃথিবী তো অন্ধকারই মনে হবে।
ভাবুন, কেউ ঘুমানোর আগে বা ঘুম থেকে উঠে স্ক্রিনে নেতিবাচক সব খবর দেখছে। মৃত্যু, খুন, দুর্ঘটনা, আগুন, ভূমিকম্প, শিশুর কান্না, যুদ্ধ, উসকানিমূলক বক্তব্য–এসব মিলিয়ে তার মনের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? মানুষ কি প্রতিদিন এত বৈপরীত্যপূর্ণ আবেগ সামলাতে পারে?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংস ও নেতিবাচক খবর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। পৃথিবীকে আরও ভয়াবহ মনে হতে থাকে, উদ্বেগ বেড়ে যায়, মনোযোগ কমে, ঘুম নষ্ট হয় এবং জীবন সম্পর্কে এক ধরণের হতাশা তৈরি হয়। যেন পুরো পৃথিবী একটি বিপদের ঘূর্ণিতে আটকে আছে।
অতিরিক্ত খবর গ্রহণের বিপরীতে মানসিক নিরাপত্তার জন্য কিছু উপায় তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ নেতিবাচক খবর কম দেখেন, কেউ প্রযুক্তি ব্যবহার কমান, কেউ ডোপামিন ফাস্টিং করেন, কেউ মানসিক বিশ্রাম নেন।
কিন্তু দায়িত্ব শুধু দর্শকের নয়, সাংবাদিকদেরও। তাদেরও উচিত নেতিবাচক খবরের মানসিক প্রভাব বুঝে দায়িত্বশীলভাবে কনটেন্ট নির্বাচন করা, ট্রেন্ডের পেছনে অন্ধভাবে না ছোটা এবং কিছু ইতিবাচক ও প্রেরণাদায়ী গল্প রাখা।
সুযোগ, উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, ভ্রমণ কিংবা অর্থনীতির ইতিবাচক খবর পাঠকের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সহিংস খবর প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা জরুরি। ভিডিওর আগে সতর্কবার্তা দেওয়া, রক্তাক্ত দৃশ্য কম দেখানো, সম্পাদকীয় বৈঠকে নিয়মিত কনটেন্ট মূল্যায়ন করা এবং মানসিকভাবে দুর্বল পাঠকদের বিবেচনায় রাখা আজকের পেশাদার সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৯ শতাংশ মানুষ সচেতনভাবে খবর এড়িয়ে চলছে। ২০১৭ সালে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ। এই অনীহা তথ্যবিমুখতা নয়, বরং এক ধরনের আত্মরক্ষা।
অতিরিক্ত তথ্য, অবিরাম কনটেন্ট এবং সংবাদপ্রবাহের ফলে মানুষ যে মানসিক ক্লান্তিতে ভোগে, তাকে বলা হয় সংবাদ অবসাদ। করোনা সংকটের সময় এই অবস্থা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এরপর যুদ্ধ, গণহত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা–সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
মানুষ খবর গ্রহণে আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায়। কেউ দ্রুত ভেঙে পড়ে, কেউ পারে সামলাতে। কেউ সাহায্য করতে ছুটে যায়, আবার কেউ অসহায় বোধ করে। সাংবাদিকরাও এর বাইরে নন।
আমরাও অনেক সময় মনে করি বিরতি নেওয়া দরকার। কারণ, অতিরিক্ত খবর মানসিক বিভ্রান্তি ও চাপ তৈরি করে। নেতিবাচক খবর উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা এমনকি অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের (ওসিডি) মতো মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কারণ, আজকের দর্শক শুধু ঘটনা দেখে না, সে গল্পের অনুভূতিগুলোও নিজের ভেতরে টেনে নেয়।
পরিস্থিতি তাই স্পষ্টভাবে একটি সত্য তুলে ধরে। খবর পরিবেশনে দায়িত্ববোধই মানসিক সুস্থতার প্রথম শর্ত। খবর অবশ্যই সত্য হতে হবে, কিন্তু সত্য এমনভাবে বলতে হবে যাতে মানুষ তথ্য পায়, আতঙ্ক নয়। সচেতনতা বাড়ে, অসহায়ত্ব নয়। যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়, ভয় নয়।
কারণ, খবর হলো আমাদের পৃথিবী দেখার জানালা। এই জানালা অন্ধকার হলে মনও অন্ধকারে ডুবে যাবে। তাই আজকের নেতিবাচকতায় ভরা সংবাদপরিবেশে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মানুষকে রক্ষা করে সত্য বলা। এটিই সাংবাদিকতার মানবিকতা।


