২০২১ সালের ১২ জুলাই চরকি যাত্রা শুরু। ওই সময় বাংলাদেশ কেবল আরেকটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মই পায়নি। এটি ছিল এমন একটি ধারণার বাস্তব রূপ, যা বছরের পর বছর ধরে নীরবে দানা বাঁধছিল। দেশের সিনেমা হলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘদিন ধরে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল খুঁজছিল। অন্যদিকে, টেলিভিশন—যা সৃজনশীল প্রতিভাদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান ছিল, তা ক্রমাগত সংকুচিত বাজেট, বিজ্ঞাপনদাতা-নিয়ন্ত্রিত প্রোগ্রামিং এবং সংক্ষিপ্ত নির্মাণ সূচির সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছিল।
ইতোমধ্যে দর্শকরা গল্প উপভোগের মাধ্যম বদলে ফেলছিল; তারা স্মার্টফোন, স্ট্রিমিং সার্ভিস এবং অন-ডিমান্ড ভিউয়িং আপন করে নিচ্ছিল। চরকি এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিল, যা ব্যবসার গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। অনেক নির্মাতা, লেখক ও অভিনেতার কাছে এটি ছিল উচ্চাভিলাষী বাংলা গল্প বলার এক নতুন আশ্রয়স্থল।
পাঁচ বছর পর, এই প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব কেবল গ্রাহক সংখ্যা বা কনটেন্ট লাইব্রেরির আকার দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। সেই সংখ্যাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করতে পারে। এর সবচেয়ে স্থায়ী অবদান হলো দেশীয়ভাবে নির্মিত গল্পগুলোর প্রতি বাংলাদেশি দর্শকদের প্রত্যাশা বদলে দেওয়া এবং দেশের নিজস্ব সৃজনশীল ইকোসিস্টেমের মধ্যে কী অর্জন করা সম্ভব, সে বিষয়ে নির্মাতাদের বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করা।
চরকি এমন এক পরিবর্তনশীল মিডিয়া পরিবেশে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যেখানে সিনেমা হলের পতন ঘটছিল, টেলিভিশন বাজেট সংকট ও বিজ্ঞাপনদাতাদের বেড়াজালে বন্দী ছিল এবং দর্শকরা ক্রমশ বিনামূল্যে ডিজিটাল কনটেন্ট দেখার দিকে ঝুঁকছিল। প্রথম আলোর মূল প্রতিষ্ঠান মিডিয়াস্টার লিমিটেডের অধীনে এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা রেদওয়ান রনির পরিচালনায় (যার আগের স্ট্রিমিং প্রচেষ্টা ছিল পপকর্ন লাইভ) প্ল্যাটফর্মটি দুই শতাধিক কনটেন্ট এবং বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভিউলিফট’-এর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর মূল ভাবনাটি ছিল সহজ: দেশীয় প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি মোহভঙ্গ হওয়া স্থানীয় দর্শকরা কনটেন্টের গুণগত মান উন্নত হলে অর্থ খরচ করতে রাজি হবেন।
পাঁচ বছর পর, সেই বাজি বা অনুমানটি কেবল আংশিকভাবে সফল বলে মনে হচ্ছে। সাংস্কৃতিকভাবে এই প্ল্যাটফর্মটি একটি বড় প্রভাব তৈরি করেছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এর পারফরম্যান্স কেমন, তা এখনো বহুলাংশে অজানা। তবে এটির স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে, তা হলো এর সৃজনশীল রেকর্ড এবং সেই রেকর্ডটি মূলত চরকি নিজেই তৈরি করেছে।
এর শুরুর দিকের কনটেন্ট তালিকা থেকেই প্ল্যাটফর্মটি প্রথাগত টেলিভিশন গল্প বলার ধারা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল। রবিউল আলম রবির ‘ঊনলৌকিক’ এবং শিহাব শাহীনের ‘মরীচিকা’ এর সুর বেঁধে দিয়েছিল, যার পর ‘জাগো বাহে’-এর মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অ্যান্থলজি সিরিজ আসে।
২০২২ সালের শুরুতে রাজশাহীর একদল অনামী তরুণদের তৈরি এবং আঞ্চলিক উপভাষায় অভিনীত নারকো-থ্রিলার ‘শাটিকাপ’ একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। এর বিপুল জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, ঢাকার বাইরের গল্পও জাতীয়ভাবে সাড়া জাগাতে পারে, যা প্রিমিয়াম বাংলা কনটেন্ট নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দু নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
পরবর্তী নির্মাণগুলো বিষয়ভিত্তিক ও নির্মাণশৈলীর সীমানা আরও প্রসারিত করে। নুহাস হুমায়ূনের ‘পেট কাটা ষ’ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডামে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশি লোকজ হররকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যায়। শিহাব শাহীনের ‘মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন’ তার নৈতিকভাবে জটিল চরিত্রের জন্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, আর মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘মিনিস্ট্রি অব লাভ’ অ্যান্থলজি প্রমাণ করে যে, স্ট্রিমিং হতে পারে চলচ্চিত্র পরিচালকদের নিজস্ব ঘরানার গল্প বলার একটি স্বাধীন জায়গা।
সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত আবু শাহেদ ইমনের ‘মারকিউলিস’ এই বিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে, যা একজন প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র পরিচালককে ওয়েব সিরিজের দুনিয়ায় নিয়ে আসে এবং প্ল্যাটফর্মটির মৌলিক থ্রিলারের ক্যাটালগকে সমৃদ্ধ করে। এই প্ল্যাটফর্মটি প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের দীর্ঘস্থায়ী ডিজিটাল আখ্যানে আকৃষ্ট করেছে, যা সিনেমা এবং স্ট্রিমিংয়ের মধ্যে একটি ক্রমান্বয়িক সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে।
একই সঙ্গে, চরকি স্ট্রিমিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সিনেমা হলের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণে পা বাড়ায়। ‘সুরঙ্গ’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’, ‘উৎসব’, ‘দাগী’ এবং ‘দম’-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোর যৌথ প্রযোজনা প্ল্যাটফর্মটিকে কেবল পরিবেশক হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রকল্পগুলো এমন একটি মডেলের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে স্ট্রিমিং এবং সিনেমা হলের প্রদর্শন একে অপরের প্রতিযোগী না হয়ে পরিপূরক মাধ্যম হিসেবে সহাবস্থান করতে পারে।
তবুও, প্ল্যাটফর্মের এই যাত্রা পুরোপুরি জটিলতাহীন ছিল না। একটি পুনরাবৃত্তিমূলক সমালোচনা হলো একটি নির্দিষ্ট সৃজনশীল বৃত্তের আধিপত্য, যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু পরিচালক এবং অভিনেতাকে প্রধান কাজগুলোতে বারবার দেখা যায়। যদিও এমন শিল্পে যেখানে আস্থা এবং পরিচিতি প্রায়শই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে, সেখানে এটি অস্বাভাবিক নয়, তবে এই ধারণাটি ইন্ডাস্ট্রির আলোচনায় এখনো রয়ে গেছে।
কনটেন্ট-সম্পর্কিত বিতর্কও তৈরি হয়েছে। কিছু নির্মাণ বাস্তব জীবনের ঘটনা বা অন্যান্য কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে সমালোচিত হয়েছে, আবার কিছু কাজ মিশ্র দর্শক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সৃজনশীল পরিবেশে এই ধরনের ঘটনা খুব অস্বাভাবিক না হলেও, এগুলো মৌলিকতা, প্রতিনিধিত্ব এবং সৃজনশীল দায়বদ্ধতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।
চরকির সবচেয়ে দৃশ্যমান ধাক্কাটি এসেছে ভারতে সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা থেকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রতিভাদের নিয়ে একটি আন্তঃসীমান্ত কনটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। তবে প্রাথমিক প্রজেক্টগুলোর শ্রম সংক্রান্ত বিরোধ এবং ২০২৪ সালের ব্যাপক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সেই পরিকল্পনাগুলোকে ব্যাহত করে। কিছু যৌথ প্রযোজনা অব্যাহত থাকলেও ব্যাপক সম্প্রসারণের সেই মূল কৌশলটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
অর্থনৈতিক দিকটিও সমানভাবে অনিশ্চিত রয়ে গেছে। চরকি এমন একটি বাজারে কাজ করে, যেখানে বিনামূল্যে পাওয়া ডিজিটাল কনটেন্ট এবং পাইরেসি সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক মডেলগুলোর ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে। সৃজনশীল মাইলফলক এবং দর্শকের কাছে পৌঁছানোর আনন্দ উদযাপন করা সত্ত্বেও, প্ল্যাটফর্মটি জনসমক্ষে তার লাভের হিসাব প্রকাশ করেনি, যার ফলে এর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশ্বব্যাপী অনেক স্ট্রিমিং ভেঞ্চারের মতো এটিও তার মূল প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে এবং একই সঙ্গে এর ব্যবসায়িক মডেলকে আরও পরিমার্জিত করার চেষ্টা করছে।
তা সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মটি তার স্থিতিস্থাপকতা বা টিকে থাকার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। সামগ্রিক জাতীয় চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এটি নিয়মিত নতুন কনটেন্ট উপহার দিয়ে গেছে, যা এর অভিযোজন ক্ষমতা এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ডিজিটাল গল্প বলার প্রতি ক্রমবর্ধমান চাহিদাকেই প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশে স্ট্রিমিংয়ের অর্থনীতি চরকি সমাধান করতে পেরেছে কি না, তা নির্ধারণ করার জন্য পাঁচ বছর খুব কম সময় হতে পারে। তবে এর সাংস্কৃতিক প্রভাব মূল্যায়নের জন্য এটি যথেষ্ট। প্ল্যাটফর্মটি বাংলাদেশি গল্প বলার সীমানা প্রসারিত করেছে—আঞ্চলিক আখ্যান, নতুন ঘরানার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতাকে আলিঙ্গন করেছে। এটি নির্মাতাদের ঐতিহ্যগত ফরম্যাটের বাইরে গিয়ে ভাবতে এবং দর্শকদের স্থানীয় নির্মাণ থেকে আরও বড় কিছু প্রত্যাশা করতে উৎসাহিত করেছে।
পরবর্তী ধাপের জন্য কাঠামোগত উদ্বেগগুলো আরও সরাসরি সমাধান করা প্রয়োজন। কনটেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা, উদীয়মান নির্মাতাদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি, ক্যামেরার পেছনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আরও সতর্ক আন্তর্জাতিক কৌশল অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার উপযোগী একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এর পঞ্চম বার্ষিকীতে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ উপসংহার হতে পারে এটি। চরকি যে সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে নেমেছিল, তার সবকটি হয়ত সমাধান করতে পারেনি। তবে এটি বাংলাদেশি পর্দার গল্প বলার প্রত্যাশাকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আরও উচ্চাভিলাষী, বৈচিত্র্যময় এবং বিশ্বমানের আখ্যানের দিকে এই রূপান্তরটিই শেষ পর্যন্ত এর সবচেয়ে স্থায়ী অবদান হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।


