লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসতে থাকায় তাদের মৃত্যু হয়। জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের কয়েকজন বর্তমানে মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জীবিত উদ্ধার হওয়া একজনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে বলে জানা গেছে। বেঁচে যাওয়া ওই যুবকের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই নৌকায় থাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচজন যুবক এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
নিখোঁজ যুবকরা হলেন, পাগলা শত্রুমর্দন এলাকার হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা।
জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট রাতে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। যাত্রার কিছুক্ষণ পর ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়।
সুনামগঞ্জের নিখোঁজ যুবক হৃদয় পালের চাচা কানন পাল বলেন, ‘হৃদয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় গত ৩১ জুলাই। সেদিন জানায় ৩ তারিখ গেমে যাবে। আমরা জেনেছি সেদিন দুটি নৌকা রওনা দেয়। এক নম্বর নৌকা থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছিল, আমার ভাতিজা দুই নম্বর নৌকায় আছে। পরে আর কোনো খোঁজ আসেনি। জেনেছি নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ১০ দিন ধরে তারা ভাসছিল।’
তিনি বলেন, ‘এখন মিশরে অনেককে জীবিত এবং মৃত হিসেবে উদ্ধার করা হলেও হৃদয়ের কোনো খোঁজ আমরা পাচ্ছি না। সে এখনো নিখোঁজ।’

বাকি নিখোঁজদের কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, প্রভাবশালী দালালরা পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করেছেন যে তাদের স্বজনরা বেঁচে আছেন। তাদের খুঁজে পেতে হলে এ বিষয়ে কোনো কথা না বলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
রোববার ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। মিশরের পুলিশ ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, খাবার ও পানির অভাবে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা।
মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।’
তিনি আরও জানান, ‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’
আব্দুল করিম জানান, বর্তমানে তারা মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মিশরের চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দেশে ফেরার আকুতিও জানান তিনি।
একইভাবে অবৈধপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগর থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধল গ্রামের যুবক লোহানী আহমদ মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তার মামা মিফতা হাসান বলেন, ‘লোহানী নৌকায় করে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার জন্য কয়েকদিন আগে রওয়ানা দিয়েছিল। গত কয়েকদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে সে মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার সঙ্গে হাসপাতালে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক রয়েছেন। তবে যে নৌকায় ১১ জন মারা গেছেন, সে ওই নৌকায় ছিল কি না, আমরা জানতে পারিনি।’


