ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির বিশ্বাস, স্বাধীনতার পর বর্তমানে তারা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাদের অনড় অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে একটি ‘বিস্ময়কর’ ফলাফলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত তৃণমূল রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী করেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং সরকার পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক সুযোগকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে জামায়াত।
এর আগে একটি বৈধ নির্বাচনে ১২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ১৮টি আসন পাওয়ার রেকর্ড থাকলেও, জামায়াত এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তবে দলটিকে এখনো বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ইস্যু।
এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সারা দেশে ২৯৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, যার মধ্যে জামায়াত নিজে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে ২১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীমের প্রতি সম্মান জানিয়ে বরিশাল-৫ আসনে জামায়াত কোনো প্রার্থী দেয়নি।
অন্যদিকে, শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে, যার ফলে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর ওপর সাধারণ মানুষ বীতশ্রদ্ধ। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এমন নেতৃত্ব চায় যারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত। জনগণ বিশ্বাস করে, যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয় তবে জামায়াত-জোট বিজয়ী হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, জামায়াত বর্তমানে তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলো থেকে কিছুটা পিছিয়ে এসে অমুসলিমদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সুযোগটি জামায়াত পুরোপুরি গ্রহণ করতে পেরেছে। সাব্বির আরও যোগ করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক, দেশের ৫১ শতাংশের বেশি নারী ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দলটি ব্যালট বাক্সে কতটা সফল হয়, তা দেখার বিষয়।’
নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে এনসিপি ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে ৩০টি আসনে, মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস ‘রিকশা’ প্রতীক নিয়ে ২৩টি আসনে এবং খেলাফত মজলিসের অন্য একটি অংশ ‘দেওয়াল ঘড়ি’ প্রতীক নিয়ে ১৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে ৭টি আসনে, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ‘ঈগল’ প্রতীক নিয়ে ৩টি আসনে, নেজামে ইসলাম পার্টি ‘বই’ প্রতীক নিয়ে ৩টি আসনে এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ‘গোলাপ’ প্রতীক নিয়ে ২টি আসনে লড়ছে।
১১-দলীয় জোট হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৯টি দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাগপা এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টিকে জোটের পক্ষ থেকে কোনো মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জামায়াত জানিয়েছে, এই দলগুলোকে পরবর্তীতে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
জামায়াত রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ১০৮টি আসনে বড় ধরনের জয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও এই অঞ্চলগুলোতে শরিক দলগুলোকে আসন ছেড়েছে খুব কম। জামায়াত নেতারা মনে করেন, সারা দেশের ৭৫টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা খোদ বিএনপির প্রার্থীদের জন্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল জামায়াত প্রার্থীদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তবে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী নিজেও বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহে বিএনপির অবস্থান শক্তিশালী হলেও সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় জামায়াত অনেক আসন পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার ভোটের হার বৃদ্ধি এবং জামায়াতের সক্রিয় প্রচারণার কারণে তারা বিএনপিকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল
জুলাই আন্দোলনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জামায়াত আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। প্রায় সব নির্বাচনী এলাকায় প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়ে তারা সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরালো করেছে। নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জামায়াত অমুসলিমদের জন্য চালু করেছে আলাদা শাখা, নারী ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে এবং বিস্তৃত করেছে সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি। এর ফল হিসেবে দেশের পাঁচটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির, যা দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক এখনো বিদ্যমান। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দলটি তাদের তৎকালীন অবস্থান পরিষ্কার করেনি বা আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি, যা দলটির রাজনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এ ছাড়া দলটি ক্ষমতায় গেলে তাদের নীতিমালা কেমন হবে, সে সম্পর্কেও জনগণের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণা নেই। তবে জামায়াত তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে। কিছুদিন আগে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া এবং নারীদের বিষয়ে তার কিছু মন্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক দলটির ভাবমূর্তিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে।
বিগত নির্বাচনের ফলাফল
জামায়াতের অতীত নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়ে দলটি ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট এবং ১৮টি আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তারা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেলেও মাত্র ৩টি আসন পায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের অংশ হিসেবে জামায়াত ১৭টি আসন পেলেও তাদের একক ভোটের হার কমে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এক-এগারো পরবর্তী ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ২টি আসন জিতেছিল।
জন্ম ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪১ সালে আবুল আ’লা মওদুদীর হাত ধরে পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর সংগঠনটিও বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে দলটি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং স্বাধীনতার পর এটি নিষিদ্ধ হয়। তবে ১৯৭৬ সালে বহুদলীয় রাজনীতি শুরু হলে তারা পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করার সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটি আবারও নিষিদ্ধ হলেও সরকার পরিবর্তনের পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত এবারের নির্বাচনকে তাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। তারা এই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা কেবল নির্বাচনের ফলাফলই বলে দেবে।


