জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যায় সহযোগিতা, সমর্থন ও উসকানির অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ওরফে শাহ আলমসহ ২৪ জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাত আরও প্রায় ২০০ জন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ অভিযোগ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মোতাসিম বিল্লাহ মাহফুজ। পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ।
অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ছাড়াও যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ম্যাকসন্স গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী খোকন, নর্দান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আব্দুল্লাহ, ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম, লোটাস কামাল গ্রুপের চেয়ারম্যান আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুব আলম।
এ ছাড়া আরও রয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, দোকান মালিক সমিতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক হেলাল উদ্দিন, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. হাতেম, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান নাসিম মঞ্জুর, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সানি, ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার পারভেজ, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল মোতালেব, বজলুর রহমান ও প্রীতি চাকমা, অটো মিউজিয়াম লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাবিবুল্লাহ ডন, বাংলাদেশ অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির মহাসচিব জহিরুল ইসলাম জহির এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ক্যাশিয়ার বিএম ইউসুফ আলী। বাকি একজনের পরিচয় জানা যায়নি।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালে ২২ জুলাই ইন্টারনেট শাটডাউনের সময় গণআন্দোলন দমনে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সহায়তার জন্য এসব ব্যবসায়ী ঢাকার ওসমানী মিলনায়তনে একত্রিত হন। সেখানে তারা সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন এবং আন্দোলন দমনের বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সালমান ফজলুর রহমান পুরো সভার হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন ও পরিচালনা করেন। সভায় আহমেদ আকবর সোবহান ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ কার্যক্রম আখ্যা দিয়ে তা ‘ধ্বংস করতে হবে’ বলে প্রধানমন্ত্রীকে উসকানি দেন। তিনি কারফিউ জারি ও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পক্ষেও মত দেন। তার বক্তব্যে উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এক পর্যায়ে মাহবুব আলম প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ৩ কোটি ব্যবসায়ী সবসময় আপনার সঙ্গে আছে, সামনেও থাকবে। আপনি আছেন বলেই আমরা আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বেই দেশ চলবে, অন্য কোনো নেতৃত্ব আমরা চাই না।’ পরে তিনি উপস্থিত সবার কাছে জানতে চান তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আছেন কি না–এতে সবাই সম্মতি জানান।
অন্যদিকে মো. হাতেম প্রস্তাব দেন, আন্দোলন ঠেকাতে দ্রুত ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দেওয়া হোক, যাতে শ্রমিকেরা আন্দোলনে যোগ দিতে না পারেন। নাসিম মঞ্জুর বলেন, প্রয়োজনে দিনে কাজ চালু রেখে রাতে কারফিউ দেওয়া যেতে পারে, যাতে কর্মীদের মাঠ থেকে ফ্যাক্টরিতে ফিরিয়ে আনা যায়।
অভিযোগে বলা হয়, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে সভায় উপস্থিত অন্যান্য বিবাদী ও অজ্ঞাত প্রায় ২০০ জন স্বৈরাচার সরকারের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাকে সহযোগিতা করা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোও সমানভাবে দায়ী। অভিযুক্ত ব্যবসায়ীরা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উৎসাহ, অর্থনৈতিক সহায়তা, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনা দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রিফাত রশিদ সাংবাদিকদের জানান, এই ব্যবসায়ীরা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে শেখ হাসিনাকে সরাসরি সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।


