রাজধানীতে বেসরকারি মালিকানাধীন বাসগুলোর ২০ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সরকার সেগুলো সড়ক থেকে পুরোপুরি সরাতে পারছে না। অথচ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) অনেক বাসই ৬ থেকে ৮ বছরের মধ্যেই অচল হয়ে পড়ছে।
বিআরটিসির বহরের বড় অংশ কেনা হয়েছে বিদেশি ঋণের অর্থে। কিন্তু দ্রুত অকেজো হয়ে যাওয়ায় এসব বাস থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কেনা ১ হাজার ৫৫৮টি বাসের মধ্যে ৩৪৩টিকে ইতোমধ্যে ‘বিয়ন্ড ইকোনমিক রিপেয়ার’ বা অর্থনৈতিকভাবে মেরামত-অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে চালু রয়েছে ১ হাজার ১০২টি বাস, আর ৬৪টি রয়েছে ভারী মেরামতের মধ্যে।
২০১৫ সালে কেনা সিএনজিচালিত ২৭৫টি বাসের প্রায় ৪২ শতাংশ পাঁচ বছরের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে। তখন বিআরটিসি নিজেই জানিয়েছিল, উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে বাসগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছিল না।
বিআরটিসির বাসের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ভলভো ডাবল ডেকার। ১৯৯৯ সালে সালে সুইডেন থেকে কেনা হয় ৫০টি বাস, ২০০২ সালে বাসগুলো সড়কে নামার পর তুমুল জনপ্রিয় হয়।
তবে রাজধানীবাসী এই সেবা খুব একটা পায়নি। ছয় বছরের মধ্যেই নষ্ট হতে থাকে গাড়িগুলো, যদিও তিন কোটি টাকার বাসের আয়ু ছিল ১৫ বছর।
এরপর আনা হয় ৫০টি জোড়াবাস। ৫৪ ফুট লম্বা এ জোড়াবাসের নাম ছিল ‘আর্টিকুলেটেড বাস’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বাস চলছে। একেকটির দাম পড়েছিল এক কোটি ১১ লাখ টাকা। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই প্রথমে ২০টি ও পরে সবগুলোই অচল হয়।
কোরিয়া থেকে আনা হয় ২৫৩টি এসি বাস, চীন থেকে আনা ২৪৫টি সিঙ্গেল ডেকার আর ভারত থেকে আনা ৪৪৩টি সিঙ্গেল ডেকার বাসও দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়।
অথচ বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে চলাচলরত ১৬ হাজার ১৯৮টি বাস ও মিনিবাস ইতোমধ্যে তাদের আইনি আয়ু পার করেছে। এর বড় অংশই বেসরকারি খাতের। সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ বাস মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও সড়কে চলছে। এ কারণে সেগুলোতে তুলে দিতে বারবার নির্দেশও দিতে হচ্ছে।
যেগুলো চলছে, সেগুলোর অবস্থাও যে খুব একটা ভালো নয়, তা উঠে এসেছে একাধিক যাত্রীর অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিআরটিসির এসি স্টাফ বাসে প্রায়ই এসি নষ্ট থাকে, জানলাও খোলা যায় না।’
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি মেট্রোরেলে যাতায়াত শুরু করেছেন।
বেসরকারি বাস ১৫–২০ বছর চললেও বিআরটিসির বাস ৬–৮ বছরে অচল কেন সে প্রসঙ্গে ২০২২ সালেই তৎকালীন বিআরটিসি চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘বাসগুলো ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার ব্যাপারটিই দায়ী।’
এদিকে, পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, ‘বিআরটিসি এত বড় বহর পরিচালনার জন্য কার্যকর কোনো সিস্টেমই গড়ে তুলতে পারেনি।’
তার মতে, ব্যয়বহুল যন্ত্রাংশ কিনতে অনীহা, জবাবদিহির অভাব এবং এক বাসের যন্ত্রাংশ খুলে আরেক বাসে লাগানোর সংস্কৃতি-এসব কারণে বাস দ্রুত অচল হচ্ছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তাও টাইমসকে নিশ্চিত করেছে দ্রুত বাস নষ্ট হওয়ার পেছনে রয়েছে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ মেকানিকের সংকট, যন্ত্রাংশের অপ্রাপ্যতা, ডিপো পর্যায়ের দুর্নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা।
বিআরটিএর ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ২০০৯–২০১৯ সময়ে কেনা ১ হাজার ৫৫৮ বাসের মধ্যে ৩৪৩টি ‘মেরামতের অনুপযোগী’ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব বাস মেরামত অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলে বিবেচিত। তাই, অনেক বাস স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। তবে, বাকি বাস গুলোর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানায় সূত্র।
অবশ্য ডিজিটাল ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট বা আধুনিক মনিটরিংয়ের পরিকল্পনা হিসাবে ২০২১ সালে বিআরটিসি চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম প্রতিটি বাসের জন্য ‘হিস্টোরি বুক’ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এতে থাকার কথা ছিল কোন বাস কতবার মেরামত হয়েছে, দুর্ঘটনার তথ্য, কোন ডিপোতে ছিল, কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে। দিয়েছিলেন ব্যক্তিগতভাবে মনিটর করার আশ্বাসও তবে দীর্ঘ ৫ বছরেও তার কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বেসরকারি কোম্পানির বাস মালিক রাজু আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘বাসের ইঞ্জিনের মেয়াদ ২০ বছর। রেজিস্ট্রেশন সেভাবেই দেয়। এই ২০ বছর পর বাসগুলো তুলে দেওয়ার কথা। কিস্তু উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
বিআরটিসির বাস তাহলে কেন এত কম টেকে-এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মেইনটেন্যান্স নেই।’
এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘সমস্যার মূল জায়গা ব্যবস্থাপনায়।’ তার ভাষায়, ‘বেসরকারি খাতের বাস মালিকেরা প্রতিদিন বাস সচল রাখাকে ব্যবসায়িক প্রয়োজন হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিআরটিসিতে দীর্ঘদিন ধরে ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট, রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। ফলে বাসগুলো দ্রুত অচল হয়ে যাচ্ছে।’
তার মতে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে সরকারি পরিবহনে সমন্বিত ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকে, যেখানে কোন বাস কখন রাস্তায় নামবে, কখন সার্ভিসিং হবে, কত জ্বালানি খরচ হচ্ছে সবকিছু ডিজিটালি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
‘কিন্তু এখানে একটি বাস সচল রাখতে আরেকটি বাস থেকে যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার মতো অস্বাভাবিক চর্চাও আছে,’ বলেন হাদিউজ্জামান।
পর্যবেক্ষণ বলছে, বিআরটিসির বহু বাস দীর্ঘদিন ডিপোতে পড়ে থাকে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো আসে না। অনেক ক্ষেত্রে একটি বাস সচল রাখতে আরেকটি বাস থেকে যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়। এতে একটি বাস সাময়িকভাবে চললেও অন্যটি স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পুরো বহরই দুর্বল হয়ে যায়।
একটি বাস দীর্ঘসময় অলস পড়ে থাকলে সেটি শুধু আয় কমায় না, যান্ত্রিকভাবেও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘসময় অব্যবহৃত থাকা, অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিম্নমানের তদারকি মিলিয়ে বাসগুলোর কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে যায়।
দক্ষ জনবলের ঘাটতিও রয়েছ। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিসির প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫১ জন চালক, কিন্তু ছিল মাত্র ২ হাজার ২৫০ জন। ফলে অনেক সচল বাসও ডিপোতে বসে থেকেছে। আর দীর্ঘসময় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা বাস দ্রুত যান্ত্রিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এমনকি অনেক পুরোনো বাস কাগজে-কলমে বহরে থাকলেও বাস্তবে সড়কে নেই। কিছু বাস বছরের পর বছর ডিপোতে পড়ে থেকে কার্যত ‘যন্ত্রাংশের গুদামে’ পরিণত হয়েছে।
বিআরটিসির সাম্প্রতিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণীতেও এই সংকটের স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশাল, বগুড়া ও টুঙ্গিপাড়া ছাড়া প্রায় সব ডিপোতেই অপারেশনাল বাসের সংখ্যা কমেছে।
অধিকাংশ ডিপোতে সচল বাসের ১০ শতাংশের বেশি ‘বসা’ বা অকেজো অবস্থায় ছিল। জানুয়ারিতে লোকসানি বাসের সংখ্যা ছিল ৪৫টি, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। এর প্রভাবে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে অধিকাংশ ইউনিট।
গত দেড় দশকে বাস কেনায় চারটি প্রকল্পের আওতায় বিআরটিসি ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতের লাইন অব ক্রেডিট থেকে এসেছে ৯০৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাকি ৩৯১ কোটি টাকা দিয়েছে নর্ডিক ডেভেলপমেন্ট ও ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ড।
কিন্তু বহরের বড় অংশ অকেজো হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, বাস কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। ফলে পুরোনো ঋণ পরিশোধে নতুন অপারেশনাল আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হকও মনে করেন, সমস্যাটি কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি মূলত ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের সংকট। তার মতে, গণপরিবহন একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক খাত। কিন্তু সেখানে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
বিআরটিসির পরিচালক (অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম টাইমসের প্রশ্নে বলেন, ‘আমাদের তো সরকার থেকে আলাদা কোনো সহায়তা আসে না। বাস অপারেট করেই চলতে হয়। রিপেয়ার করার মতো পর্যাপ্ত অর্থও নেই।’
বেসরকারি কোম্পানি বাস চালিয়েই আয় এবং মেরামত করটে পারলেও, বিআরটিসি কেন পারছে না? এই প্রশ্নে বিআরটিসি পরিচালক মো. রাহেনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার থেকে তো আমাদের কাছে কোনো সাহায্য সহযোগিতা আসে না। বাস অপারেট করে আমাদের চলতে হয়। বেশি টাকা লাগে। ওই পরিমাণ অর্থ আমাদের নেই।’
বিআরটিসির সাম্প্রতিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণীতেও দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ ডিপোতে অপারেশনাল বাসের সংখ্যা কমেছে এবং লোকসানি বাসের সংখ্যা ৪৫ থেকে বেড়ে ৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে একাধিক ডিপো নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি জ্বালানি ব্যয় করেছে। ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) দিয়ে ‘ব্রেকডাউন’ তথ্য যাচাইয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কারণ, সচল বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে বসিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
বিআরটিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মেরামত কাজের জন্য তৈরি করা দুটি কারখানায় আদৌ কী কাজ হয়, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন।
এর মধ্যে ১৯৮১ সালে ১৪ একর জায়গার ওপর জাপানি কারিগরি ও আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয় গাজীপুর কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানাটি। এ ওয়ার্কশপে গাড়ি সংযোজন, বডি নির্মাণ ও গাড়ি মেরামত করা হতো। এ ওয়ার্কশপেই ভলভো দ্বিতল বাসের বডি সংযোজন করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০০৯ সালে সরকারের কাছ থেকে ৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১১১টি একতলা ও দ্বিতল গাড়ির ভারী মেরামত কাজ করা হয় এখানে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। তবে বিআরটিএ বলছে, কারখানাটি গত ২০২১ সাল থেকে পুনরায় সচল করা হয়েছে।
তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেরামত কারাখানায় এখন কার, জিপ, মাইক্রোবাস এবং অল্প সংখ্যক বাস ও ট্রাক মেরামত করা হয়।


