ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবস্থা বাদ দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর বদলে চালু হচ্ছে অ্যাপ-ভিত্তিক ভ্যাট আদায় পদ্ধতি। তবে নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্রেও রয়ে গেছে আগের ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কাজ শেষ করার শর্তাবলি পালনে ব্যর্থতা এবং অনেক অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এনবিআর জেনেক্স ইনফোসিসের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেনি। এমনকি অ্যাপ-ভিত্তিক নতুন ব্যবস্থার বেলাতেও এই কোম্পানির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি।
বিক্রয় কেন্দ্রে ভ্যাট ফাঁকি রোধ করার জন্য ইএফডি মডেলটি চালু করেছিল এনবিআর। এই ব্যবস্থার অধীনে দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস বসানোর কথা ছিল। প্রতিটি ডিভাইসের কাজ ছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিটি বিক্রয়ের তথ্য রেকর্ড করা, ভ্যাট ইনভয়েস তৈরি করা এবং লেনদেনের তথ্য সঙ্গে সঙ্গে এনবিআর সার্ভারে পাঠানো। এর উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে তদারকির মাধ্যমে বিক্রয় তথ্য গোপন করার সুযোগ বন্ধ করা।
এনবিআরের নিজস্ব প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন বছর পর এই সিস্টেম বাস্তবায়ন এখনো লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশের নিচে আটকে আছে। এর ফলে রাষ্ট্র পর্যাপ্ত ভ্যাট সংগ্রহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে এনবিআর জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের সঙ্গে একটি পাঁচ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী, জেনেক্সের প্রথম বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকায় ৬০ হাজার ইএফডি মেশিন বসানোর কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ কোম্পানিটি মাত্র ১৪ হাজার ২৪৮টি ডিভাইস বসানোর কথা জানায়। পরবর্তীতে এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের যাচাইয়ে দেখা যায় যে ডিভাইসের প্রকৃত সংখ্যা আরও কম ছিল।
এনবিআর পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত করে। তারা আবারও একই এলাকায় ৬০ হাজার ডিভাইসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু ফলাফল ছিল আরও খারাপ। ২০২৪ সালের জুন নাগাদ এনবিআর জেনেক্সকে ৪২ হাজার ২৩৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিলেও কোম্পানিটি বর্ধিত সময়ে মাত্র ১১ হাজার ৩১৩টি অতিরিক্ত ডিভাইস বসায়। জেনেক্স ১৯৫টি সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (ছোট ব্যবসার জন্য সহজ ডিভাইস) বসানোর দাবি করলেও মাঠ পরিদর্শনে মাত্র ৯৭টি সচল পাওয়া যায়। সমস্ত সময়সীমা পার হওয়ার অনেক পরেও প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন মাত্র ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে।
এনবিআর-এর গবেষণা ও পরিসংখ্যান উইংয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মুহাম্মদ রাশেদুল আলমের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি কমিটির প্রতিবেদনে জেনেক্সের এসব অনিয়মের তথ্য ওঠে আসে।
মাঠ পরিদর্শনের পর কমিটি বলেছে, জেনেক্সের পারফরম্যান্সে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই অনেক বেশি। প্রতিবেদনে সিস্টেমে দেখানো ডিভাইসের সংখ্যা এবং বাস্তবে বসানো ডিভাইসের সংখ্যার মধ্যে বড় গরমিল চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ডিভাইস বসানোর কাজ কার্যত স্থবির ছিল। যেখানে ডিভাইসগুলো বসানো হয়েছে, সেখানেও ব্যাপক পরিচালনাগত সমস্যা ছিল। অনেক যন্ত্র ঠিকমতো তথ্য পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। এগুলোর ড্যাশবোর্ড ব্যবহারকারী-বান্ধব ছিল না। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর মনিটরিং কঠিন ছিল। যদিও চুক্তিতে জেনেক্সের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কমিটি এর কোনো প্রমাণ পায়নি। কমিটি বলেছে, কয়েকটি বাজারে মাঝেমধ্যে কিছু ব্রিফিং দেওয়াকে সঠিক প্রশিক্ষণ বলা যায় না। এর ফলে ব্যবসায়ীরা সিস্টেমটি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছিল না এবং এটি বড় পরিসরে চালু করাও সম্ভব হয়নি।
জনবল ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত অপর্যাপ্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। জেনেক্সের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১১ হাজার ৪১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তদারকি করার জন্য মাত্র ৪৪ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে একজন কর্মকর্তা গড়ে ৭৯টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়বদ্ধ ছিলেন। অফিসের সময়ের বাইরে কোনো সাহায্য পাওয়া যেত না। যখন ডিভাইসগুলো নষ্ট হতো, তখন সমস্যাগুলো দিনের পর দিন ঠিক হতো না। এর ফলে ব্যবসায়ীরা মেশিন বন্ধ রেখেই কাজ চালাতেন এবং বিক্রয়ের তথ্য রিপোর্ট করতেন না।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জেনেক্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও জোরালো হয়। কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডিভাইস না বসানো, আমদানির নিয়ম লঙ্ঘন করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং এনবিআর কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের প্রতারিত করার অভিযোগ ওঠে।
এক পর্যায়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জেনেক্সের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিকল্প পথ খুঁজতে নির্দেশ দেন। তবে এরপরও নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
জেনেক্স কর্মকর্তারা অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। টাইমস অব বাংলাদেশে’র পক্ষ থেকে কোম্পানির যোগাযোগ বিভাগে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও এক মাসেও কোনো উত্তর মেলেনি।
এনবিআর সূত্রের মতে, ডলারের দাম বাড়ায় ডিভাইস আমদানির খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। জেনেক্স তখন সংগৃহীত ভ্যাটের ওপর নির্ধারিত কমিশনের চেয়েও বেশি দাবি করে। এনবিআর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। কমিশন নিয়ে এই বিরোধ কাজকে আরও স্থবির করে দেয়।
জেনেক্সের এত বড় ব্যর্থতা সত্ত্বেও এনবিআর তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন সদস্য আজিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, জেনেক্সের সঙ্গে চুক্তিটি ছিল পাঁচ বছরের জন্য। হঠাৎ করে এটি বাতিল করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কিছু ডিভাইস এখনো সচল থাকাকেও তিনি চুক্তি বহাল রাখার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এনবিআর এখন ইএফডি সিস্টেম মেরামত করার বদলে অ্যাপ-ভিত্তিক ভ্যাট সংগ্রহের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন মডেলে ব্যবসায়ীরা বিক্রয় রেকর্ড করতে এবং ডিজিটাল ভ্যাট ইনভয়েস তৈরি করতে একটি মোবাইল বা ওয়েব-ভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করবেন। এতে কোনো আলাদা ডিভাইসের প্রয়োজন হবে না।
তবে এই পরিবর্তন এনবিআরের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠেছে যে, যদি অ্যাপ দিয়েই কাজ চালানো যেত, তবে কেন কর্তৃপক্ষ হার্ডওয়্যার-নির্ভর মডেলের পেছনে এত বছর সময় নষ্ট করল এবং একটি বেসরকারি কোম্পানিকে ভ্যাটের অংশ দেওয়ার চুক্তি করল।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লক্ষ ৭৫ হাজার নিবন্ধিত ব্যবসা রয়েছে। বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয় এমন ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচটি ভ্যাট কমিশনারেট, কক্সবাজার এবং মহাসড়কগুলোতে এই অ্যাপ-ভিত্তিক সিস্টেম চালু করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অ্যাপ-ভিত্তিক ব্যবস্থার কেন্দ্রেও রয়ে গেছে জেনেক্স। এনবিআর বিদ্যমান চুক্তি বাতিল না করে জেনেক্সকেই এই অ্যাপ স্থাপনের দায়িত্ব দিয়েছে। অবশ্য প্রযুক্তিগত কাজ সম্পন্ন করবে জার্মানির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস। তাদেরকে সহায়তা দেবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান রিলিভ ভ্যালিডেশন লিমিটেড। এজন্য জেনেক্সের সঙ্গে চুক্তি করেছে ভেরিডোস।
ভেরিডোস-এর পরিচালক মো. সাইদুর রহমান টাইমসকে বলেন, নির্ধারিত এলাকায় প্রায় দুই লাখ নিবন্ধিত ব্যবসা আছে। তাদেরকে এই অ্যাপের আওতায় আনতে ৬-৭ মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন এই ব্যবস্থায় কোনো ডিভাইস কেনার প্রয়োজন নেই এবং ভ্যাটের টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে। কেন তারা সরাসরি এনবিআরের সঙ্গে চুক্তি না করে জেনেক্সের হয়ে কাজ করছে, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, সরাসরি চুক্তি করতে অনেক সময় লাগে। এ ছাড়া জেনেক্সের চুক্তি এখনও শেষ হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এনবিআর-এর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আলাদা মনিটরিং সেল গঠন না করা হলে আগের মতোই নতুন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা আছে।
তাদের মতে, ‘ব্যাক এন্ড ফোর্থ’ বা ক্রয় এবং বিক্রয়ের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা কর্তৃক সঠিকভাবে ভ্যাট চালান নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করছে এর সফলতা।
উদাহরণ হিসেবে তারা আরও বলেন, শুধু ঢাকা শহরেই ৫০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে। এর বিপরীতে কর্মকর্তা আছেন প্রায় ১২০০ জন। নিয়মিত কাজের বাইরে এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন তদারকি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথচ তা মোকাবিলায় সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা হয়নি।
এ ছাড়া নীতিতে ঘনঘন পরিবর্তনে ব্যবসায়ীরাও বিরক্ত। তাদের আশঙ্কা, বাস্তবায়নে দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপরই বাড়তি চাপ পড়বে।
ভ্যাট আইন বিশেষজ্ঞ বিন্দু সাহা টাইমসকে বলেন, এখাত থেকে রাজস্ব আদায়ে এনবিআর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রচলন করেছে। এতে ব্যবসায়ীরা দ্বিধায় পড়ে যায়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে এনবিআরের সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থাও তৈরি হয়।
বর্তমানে অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হয়নি জানিয়ে বিন্দু সাহা বলেন, এ কারণে নতুন ব্যবস্থাও ব্যর্থ হতে পারে।
তবে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (ভ্যাট পলিসি) বদরুজ্জামান মুন্সি টাইমসকে বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশন ছাড়া কোনো পদ্ধতিই টেকসই বা কার্যকর হতে পারে না। এ লক্ষ্যেই এনবিআর একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে সব নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ইনভয়েসিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সরবরাহ করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দুই বছরের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তখন এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণে পৌঁছাবে।


