বিচারালয় বিএনপির দখল থেকে মুক্ত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
তিনি বলেছেন, ‘জনগণ জিম্মিদশা ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় তাদের ভোটটা রক্ষা হোক। জাতীয় নির্বাচনে অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা বা যেকোনো কারণে আমরা ভোট রক্ষা করতে পারিনি। উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। বিচারালয়ও বিএনপির দখল থেকে মুক্ত হচ্ছে না।’
মঙ্গলবার ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সবুজ প্যানেলের পরিচিতি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম আরও বলেন, ‘আপনারা নির্বাচনে একটি ভোটও চুরি করতে দেবেন না। এই ভোট জনগণের বিশ্বাস ফেরানোর, আগামীতে তারা আপনাদের ভোট দিলে তা রক্ষা করতে পারবেন কি না। আমরা যারা ইনসাফের পক্ষে, আমাদের লড়াইয়ে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। সামান্য বিভাজনও বিজয় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। এই নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে আগামী সব জেলা নির্বাচনে ইনসাফের পক্ষের প্রত্যেক প্রার্থী বিজয়ী হবে।’
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার দুই মাসের মধ্যে জনগণকে রাজপথে আসতে বাধ্য করছে। যে ইস্যু সংসদে সমাধান হওয়া উচিত, সেটিকে রাজপথে আনা উচিত নয়। ফলাফলে কারচুপি করে আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন। এটা আপনারাও জানেন, জনগণও জানে। গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করবেন না। আমরা সংসদে লড়াই করব এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেও আন্দোলন গড়ে তুলব। এ ক্ষেত্রে বার সমিতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘আমরা জুলাই শহীদের মাকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করিয়ে জুলাইকে সংসদে নিয়ে যাচ্ছি, আর একটি দল ফ্যাসিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করেছে এমন ব্যক্তিকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা (বিএনপি) ৭০ শতাংশ জনগণের রায় গণভোটকে বাতিল করে টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ করে প্রমাণ করছে জনগণের আস্থার জায়গায় তারা যেতে পারবে না। দুই মাসে লক্ষ করেছি, সরকার পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দলীয়করণ করছে এবং নব্য ফ্যাসিবাদকে স্থানান্তর করছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের পরে এই বাংলাদেশ অতীতে কখনো কল্পনা করা যায়নি। যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই হয়েছিল, সেটি নিছক ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনের জন্য ছিল না। বাংলাদেশকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্যই জুলাই হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে বিচারকরা এক্সিকিউটিভের কাছে মাথা নত করবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পরিবর্তিত বিচারব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও আদেশ দিতে দ্বিধাবোধ করবে না। এমন বিচারালয় না হলে আমাদের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার স্বপ্ন ব্যর্থ হবে। আমরা ইঙ্গিতনির্ভর সুপ্রিম কোর্ট দেখতে চাই না। আমরা এমন বিচারালয় চাই, যেখানে সবচেয়ে তুচ্ছ মানুষটিও বিচার পাবে এবং সবচেয়ে ছোট ম্যাজিস্ট্রেটও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আদেশ দিতে পারে। আপনারা ন্যায়ের পথে থাকুন, বিবেককে কাজে লাগান–কেউ আপনাদের পরাজিত করতে পারবে না। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি, এবং সেই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করব।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হলে এবং আইনজীবীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য না হলে সমাজের মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না।’
‘বিচার বিভাগীয় সচিবালয় ছিল, এই সরকার তাদের জুলাই সনদে কোনো নোট অব ডিসেন্ট না থাকলেও তা বাতিল করেছে। আমরা রিট করেছি, মঙ্গলবার তিনটি আপিল ফাইল হয়েছে। আমরা এই সচিবালয়ের স্থিতাবস্থা চেয়েছি। আমরা বিজয়ী না হলে আগামী পাঁচ বছরে ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক্সিকিউটিভের লোক এসে যদি বিচারকে বদলে দেয়, আইন মন্ত্রণালয়ের করায়ত্ত্ব থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত না করা যায়, তবে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা যাবে না। এ দেশে যদি জবাবদিহিতা তৈরি করতে হয়, তাহলে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে; তবে বাংলাদেশ একটি নতুন সূচনা দেখতে পারবে। জুডিশিয়ারিকে রক্ষা করতে না পারলে টু-থার্ড মেজরিটির জোরে সংবিধানকে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির পর এই প্রথম ঢাকা বারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভূতপূর্ব খেলা হয়েছে। সরকার গঠনের পর তারা অগণতান্ত্রিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ঢাকা বারের নির্বাচন কমিশন যেভাবে গঠন হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’
ঢাকা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম, ঢাকা বার ইউনিটের সভাপতি আব্দুর রহমান মুসাসহ জামায়াত ও এনসিপির নেতারা।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল) এবং জামায়াত-এনসিপি সমর্থিতরা আইনজীবী ঐক্য পরিষদের (সবুজ প্যানেল) ব্যানারে অংশ নিচ্ছেন।


