ফ্যাসিবাদ রুখতে জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর

ফ্যাসিবাদ রুখতে জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: পিএমও
Advertisement
Advertisement

দেশে আর কখনো যেন ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য সরকারি ও বিরোধী দলসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের পর্যায়ক্রমিক সকল কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধা একটি ইউনিভার্সাল কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার কথা জানান তিনি।

এ ছাড়া দেশের ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়ে একটি টেকসই বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শিগগিরই এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের মতো গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও আহতদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপির স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দ্বিমত থাকলেও দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বুধবার রাতে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, প্রান্তিক কৃষক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমান সরকারের পর্যায়ক্রমিক সকল কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধা একটি একক কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’। জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেট সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি তার দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ এবং রাষ্ট্র উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড কিংবা ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের জন্য দেওয়া বিশেষ কার্ডের মতো সুযোগ-সুবিধাগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব।

এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই ভবিষ্যতে আলাদা আলাদা সকল কার্ডের সমন্বয়ে এই সর্বজনীন বা ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা একক পরিচয় ও কার্ডে সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা লাভ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচির গুরুত্ব এবং এই প্রক্রিয়ায় দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

তিনি সংসদকে জানান, গতকাল যখন একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে তার নিজ এলাকায় কবে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে তা জানতে চান, তখন তিনি অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো কল্যাণমুখী সামাজিক পলিসিকে সমর্থন জানানোর জন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিরোধী দলের সকল সংসদ সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু যখন দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়ের কথা আসে, তখন সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এবং বিদেশি তাবেদারি রুখতে হলে রাষ্ট্র এবং দেশের জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই শক্তিশালীকরণের প্রথম ধাপই হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করা।

দেশের ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়ে একটি টেকসই বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের বিস্তারিত রূপরেখাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে।

তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। এই বিপুল অর্থ পাচার ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই দেশের সার্বিক অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও জনজীবনের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই কালো অধ্যায় থেকে দেশকে বের করে আনতে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে দুর্নীতির টুটি চেপে ধরতে বদ্ধপরিকর।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। যেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। সরকার কেবল যুবসমাজকে ঘরে বসিয়ে না রেখে দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করতে চায়। এই লক্ষ্যে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লক্ষ, ব্লু ইকোনমি ও ইকোটুরিজম খাতে আরও ১০ লক্ষসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে পর্যায়ক্রমে ৯ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

এ ছাড়া যুবসমাজকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদানুযায়ী গড়ে তুলতে দেশজুড়ে বিভিন্ন ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত ৩১ দফা এখন জাতীয় দলিলে পরিণত হয়েছে। বিগত নির্বাচনে জনগণ এই ৩১ দফার প্রতি রায় দিয়েছে। এটি এখন জনগণের ৩১ দফা। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে আমরা যে ‘জুলাই সনদ’ সই করেছিলাম, তার প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’

দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগসহ প্রতিটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্তরণের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচারী আমলে অটো-প্রমোশন ও নকলকে উৎসাহিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা হয়েছিল। আমরা এই ধারা পরিবর্তন করছি। শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও বিতর্কিত সিলেবাস সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।’

স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন স্বাস্থ্য খাত ১০০ ভাগ অসুস্থ, আমি বলি ১০১ ভাগ অসুস্থ। আমরা এই খাতকে পুনর্গঠন করতে চাই।’

তিনি জানান, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লক্ষ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের সুচিকিৎসায় আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচটি বিভাগে ২০০ বেড করে মোট এক হাজার বেডের পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে।

স্বাস্থ্য খাতেও আগামী ৫ বছরে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে ৩ লক্ষ কোটি টাকার হরিলুট হয়েছে। কুইক রেন্টালের নামে কুইক মানি অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। জ্বালানি মজুত মাত্র ৩০ দিনের কম ছিল, যা আমরা এরই মধ্যে ৪৫ দিনে উন্নীত করেছি এবং ৯০ দিনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি আরও জানান, বিদেশিদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে সক্রিয় করা হচ্ছে এবং তাদের জন্য নতুন রিগ আমদানি করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা এবং প্লাস্টিক-পলিথিন ফেলা রোধে জনসচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়তে ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোর পরিবর্তন জরুরি।

সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও কোনো শত্রুতা থাকবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে দেশে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদের কবলে না পড়ে এবং তাবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়, সেজন্য জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের রীতি অনুযায়ী আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে, তবে শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। বাংলাদেশ আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং এই প্রিয় মাতৃভূমি আর যাতে তাবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়–সেই প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতিই নয়, বরং আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটেছে। এই মূল্যবোধকে যেকোনোভাবেই হোক আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ছোটবেলার বিখ্যাত ছড়া উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’-আমাদের এই ছোটবেলার মূল্যবোধকে যেকোনো মূল্যে এই সংসদে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা যদি এই দেশকে গঠন করতে চাই, তবে এই সকল মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad