বিশ্ব হকির মঞ্চে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২১ দলের এবারের যাত্রাটি ছিল যেন চ্যালেঞ্জ আর সাফল্যের এক মহাকাব্য। গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-৫ গোলে হারলেও সেখানে আমিরুল ইসলামের হ্যাটট্রিকে দেখা মিলেছিল লড়াকু মানসিকতার। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র করে টুর্নামেন্টে টিকে থাকার বার্তা দেয় যুবারা। এমনকি গত আসরের রানার্সআপ ফ্রান্সের বিপক্ষেও মাত্র ৩-২ গোলের ব্যবধানে হেরেছিল মেহরাব হোসেন সামিনের দল। এরপর শুরু হয় চ্যালেঞ্জার ট্রফির মঞ্চে বাংলাদেশের দাপট। ওমানকে ১৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শুরু করে, কোরিয়াকে ৫-৩ এবং সবশেষ ফাইনালে অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে পরাজিত করে ঐতিহাসিক ‘চ্যালেঞ্জার ট্রফি’র শিরোপা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এই ঐতিহাসিক সাফল্য কীভাবে অর্জিত হলো, দলের মূলশক্তি কোথায় এবং ভবিষ্যতের জন্য ফেডারেশনের কী পরিকল্পনা এসব নিয়ে ‘ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপচারিতায় অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং অনূর্ধ্ব-২১ জাতীয় হকি দলের টিম ম্যানেজার লে. কর্নেল (অব.) রিয়াজুল হাসান।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের শুরুর দিকে খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং স্কিলের সামগ্রিক অবস্থা কেমন ছিল? সেই সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো আপনারা কীভাবে মোকাবেলা করেছিলেন?
রিয়াজুল হাসান: প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের শুরু থেকেই আমরা এক মাস সময় দিয়েছিলাম ওদের ফিটনেসটাকে ইম্প্রুভ করার জন্য। পরবর্তীতে প্ল্যান ছিল কোচের মাধ্যমে তারা খেলা ইম্প্রুভ করবে, স্ট্রাকচার ঠিক করবে, ট্রেনিং করবে এবং সাথে সাথে ফিটনেস যেখানে কমতি আছে, সেটা ইম্প্রুভ করবে। এই চ্যালেঞ্জটা চিন্তাভাবনা করেই আমরা ফিটনেসের প্রোগ্রামটা আগে রেখেছিলাম।
ক্যাম্প শেষে এবং টুর্নামেন্টে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে দলের আত্মবিশ্বাস বা মনোবল কতটুকু ছিল বলে আসলে আপনি মনে করেন?
রিয়াজুল হাসান: টুর্নামেন্টে আসার আগে থেকেই ছেলেদের মনোবলটাকে তৈরি করা হয়েছিল। কোচরা ওদেরকে বুঝিয়েছেন যে তোমরা কোনোক্রমেই কম নও। তোমরা যদি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলো, যেভাবে তোমাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এভাবে খেলো, তোমরা অবশ্যই একটা ভালো ফাইট দিতে পারবে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এবং ওদের মনোভাবটা তৈরি করাতে ওদের খুব উপকার হয়েছে।
গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছে—যেমন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-৫ গোলে লড়াই করা কিংবা ফ্রান্সের কাছে সামান্য ব্যবধানে হার, এই ‘ফাইটিং স্পিরিট’কে আপনি আসলে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রিয়াজুল হাসান: গ্রুপ পর্যায়ে বাংলাদেশ যে খেলা দেখিয়েছে, অবশ্যই এই লড়াকু মনোভাবটা ওদের মধ্যে তৈরি হয়ে এসেছিল বলেই ওরা পেরেছে। এটাও ঠিক, আমরা আন্ডারডগ হিসেবেই পরিচিত ছিলাম। অনেকে মনে করেছিলেন যে একটা ভালো ব্যবধানে এই দলটি হারবে। আল্লাহর রহমতে, ছেলেদের আত্মবিশ্বাস, কোচদের কঠিন পরিশ্রম সব মিলিয়ে ওরা প্রমাণ করল যে, যদি মন দিয়ে খেলে, কথা শুনে খেলে অবশ্যই একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দলগুলো বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে? আমাদের খেলা দেখে কি তারা বিস্মিত হয়েছে?
রিয়াজুল হাসান: প্রথম খেলার পরেই অনেকে আমাদেরকে বলা শুরু করল যে ‘তোমাদের টিম তো ভালোই খেলে’। কোরিয়ার সাথে যখন আমরা ৩-৩ ড্র করলাম, তখন সবাই বলা শুরু করল, ‘ইয়োর টিম ইজ প্লেয়িং গুড’, ‘দে রিয়েলি প্লে গুড’। এবং ফ্রান্সের সাথে যখন একটা ভালো ফাইট দিলাম আমরা, তখন সবাই একটাই কথা ‘ইয়োর টিম ইজ প্লেয়িং এক্সিলেন্ট’। আমি যাদেরকে চিনি, ওরা আমাকে বলছে, যারা আইকম্যান (কোচ)-কে চেনে তারা আইকম্যানকে বলছে যে ‘আমরা তো মনে করিনি এত ভালো খেলবে’।
আমিরুলের হ্যাটট্রিক এবং পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তার সাবলীল পারফরম্যান্স বেশ নজর কেড়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এই দক্ষতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
রিয়াজুল হাসান: আমিরুলের দক্ষতা অবশ্যই ভালো। তাকে স্কিলটা আরও ইম্প্রুভ করতে হবে। একজন ডিফেন্ডার হিসেবে সে পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। তবে আমাদেরকে একটা কথা মনে রাখতে হবে, এটা একটা দলগত খেলা। ফরোয়ার্ডরা যদি পেনাল্টি কর্নার আদায় না করত, তবে আমিরুল গোল করার সুযোগ পেত না। প্লেয়াররা পেনাল্টি কর্নার যোগাড় করছে, আমিরুল ওটাকে কাজে লাগিয়েছে এবং এটাতে টিম খুবই ভালো ফলাফল পেয়েছে। অবশ্যই আমিরুল একজন ভালো পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। তার উচিত এটাকে ধরে রাখা এবং আরও বেশি প্র্যাকটিস করা। কারণ পিসি (পেনাল্টি কর্নার) এখন খেলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কোচ সিগফ্রিড আইকম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্তটা কি আপনি মনে করেন যে সফল হয়েছে? আর এই দলের উন্নতির ধারা বজায় রাখতে তাঁকে কি দীর্ঘমেয়াদে রেখে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনাদের রয়েছে কিনা?
রিয়াজুল হাসান: কোচ সিগফ্রিড আইকম্যানকে কোচ হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া সাফল্য কিনা এটা আপনারা বলবেন। তবে দলের এই উন্নতির ধারাটা বজায় রাখতে হলে সবাইকে মিলে খুব কাজ করতে হবে। এবং এটার জন্য আর্থিক সহায়তার খুব প্রয়োজন। আমাদের বিশ্বাস, এই ফলাফলে হয়তো আমরা আরও কিছু স্পন্সর পাবো। স্পন্সর যত পাবো, খেলা, ট্রেনিং, বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ তত বাড়বে। আইকম্যানকে লং টার্ম রাখার ব্যাপারে এখনো কোনো আলাপ-আলোচনা হয় নি। কেন না, এমন একজন বিদেশি কোচকে লং টার্ম প্ল্যানিং করে রাখতে যে খরচ, সেটা সরকারের সাহায্য ছাড়া সম্ভব না। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করব, এই ব্যাপারে যেন উনারা আমাদেরকে সহায়তা করেন।
জুনিয়র দল বিশ্বমঞ্চে নিজেদেরকে প্রমাণ করেছে। এখন এই উদীয়মান খেলোয়াড়দের পরিচর্যা এবং পরবর্তী ধাপের জন্য তৈরি করতে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি? আর হকি নিয়ে সাধারণ মানুষের যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তা ধরে রাখতে কী উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন?
রিয়াজুল হাসান: সোশ্যাল মিডিয়ায় হকি খেলার সাধারণ মানুষের একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, এটা অবশ্যই ভালো। সাধারণ মানুষ এখন জানতে পারছেন যে ফুটবল এবং ক্রিকেট বাদেও বিশ্বমন্ডলে হকি বাংলাদেশ ভালো করছে। এই খেলাটাকে এভাবে চালিয়ে রাখা, এটার ক্রেজ বাড়াতে হলে খেলাটাকে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগেও খেলতে হবে। এটা শুধু ফেডারেশনের পক্ষে একা না, এটাতে সরকারের সাহায্যও প্রয়োজন। আমরা আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে হয়তো ছেলেদের খেলাও একটি ভালো স্পন্সর পেয়ে আমরা এভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।


