তিন মাস পর মাকে ফিরে পেয়েছে নতুন কুড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন রংপুর বিভাগীয় বালিকা ফুটবল দলের স্ট্রাইকার স্মৃতি কিসকু। সেই ফিরে পাওয়ার আনন্দে তার একটাই আবদার–কেলির মতো বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে মাকে আর কোথাও যেতে দেবে না।
নতুন কুড়ি স্পোর্টসের ফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে শিরোপা জিতিয়েছিল কিসকু। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দও তার কাছে অসম্পূর্ণ ছিল। কারণ প্রায় তিন মাস ধরে মায়ের কোনো খোঁজ ছিল না। মায়ের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় কোথায় আছেন, সেটিও জানত না সে।
ফাইনালের পর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিসকু মায়ের নিখোঁজ থাকার কথা জানায়। বিষয়টি নজরে নেয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। পরে গাজীপুরের বাইপাস এলাকায় একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে থাকা কিসকুর মা মাতি মাই হেমরনের খোঁজ পাওয়া যায়। শুক্রবার তাকে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়ে গিয়ে একটি মোবাইল ফোন ও ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাড়ি নির্মাণে সহায়তা, চাকরির ব্যবস্থা এবং এক মাসের মধ্যে কিসকুকে ইয়ুথ ক্লাবে প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর তাকে রংপুরে মেয়ের কাছে পাঠানো হয়।
শনিবার দুপুরে হাতে নতুন ফোন আর ফুটবলের ব্যাগ নিয়ে পালিচড়া স্টেডিয়ামে পৌঁছান হেমরন। আগে থেকে মায়ের অপেক্ষায় ছিলেন কিসকু। স্টেডিয়ামের সরু গেট দিয়ে ঢুকতেই বিভাগীয় কমিশনারের দেওয়া ফুলের মালা দিয়ে মাকে বরণ করে সে। এরপর দীর্ঘক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকেন দুজন। মা-মেয়ের চোখে তখন আনন্দ আর অশ্রু একসঙ্গে।
পরে মাকে নিয়ে যায় প্যাভিলিয়নের অস্থায়ী আবাসে। সেখানে সহখেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে তারা। ক্রীড়া মন্ত্রীর দেওয়া নতুন ফোনটি মেয়ের হাতে তুলে দেন মা। নতুন ফোনে কখনো মায়ের সঙ্গে, কখনো সতীর্থদের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কিসকু।
মাকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত কিসকু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলে, ‘তিন মাস পর মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। অনেক ভালো লাগছে। এতদিন একটুও ভালো লাগত না। চ্যাম্পিয়ন হয়েও ভালো লাগেনি, কারণ মা ছিল না। এখন মাকে পেয়েছি, অনেক ভালো লাগছে। মাকে জড়িয়ে ধরে যে অনুভূতি হচ্ছে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দও এর কাছে কিছু না। টিমের সঙ্গে ঠিকমতো আনন্দও করতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে সবকিছু ফিরে পেয়েছি।’
স্মৃতি কিসকুর মা মাতি মাই হেমরন টাইমসকে বলেন, ‘গ্রামে কোনো কাজ ছিল না। তাই গাজীপুর বাইপাসে গিয়ে একটি বাসায় কাজ নিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর ফোন নষ্ট হয়ে যায়। তাই মেয়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। আমারও অনেক কষ্ট হয়েছে। তিন মাস পর মেয়েকে ফিরে পেয়ে মন ভরে গেছে। সবাই দোয়া করবেন, আমার মেয়ে যেন আরও বড় খেলোয়াড় হতে পারে।’
মায়ের কাছ থেকে নতুন ফুটবল পেয়ে আনন্দ আরও বেড়ে যায় কিসকুর। এরপর নিজের স্বপ্নের কথাও জানায় সে।
‘আমি মাকে আর কোথাও যেতে দেব না। আমার অনুমতি ছাড়া মা কোথাও যাবে না। আমাকে ভালো খেলতে হবে, তাই মাকে আমার পাশে থাকতে হবে। ফাইনালে যে গোল করেছি, সেটা কেলির মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি কেলিকে অনুসরণ করি। ওর মতো খেলতে চাই। এজন্য মাকে পাশে দরকার’, বলেন কিসকু।
মেয়ের স্বপ্ন পূরণে সরকারের সহযোগিতা চান হেমরনও। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী বলেছেন মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন। যদি আমাকে সেখানে একটা চাকরিও দেওয়া হয়, তাহলে মেয়ের কাছে থাকতে পারব। আর গ্রামের বাড়িটা যদি করে দেওয়া হয়, তাহলে ঢাকায় অনুশীলন শেষে নিজের বাড়িতেও ফিরতে পারব। সবচেয়ে বড় কথা, ফুটবল খেলতে ভালো খাবার লাগে। আমার সেই সামর্থ্য নেই। সরকার যদি ওর খাবারের ব্যবস্থা করে, তাহলে ওর স্বপ্ন পূরণ হবে।’
কিসকুর প্রধান কোচ মিলন মিয়া টাইমসকে বলেন, ‘সে কখনো বুঝতে দেয়নি যে তিন মাস ধরে মায়ের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। ও শুধু খেলাতে মন দিয়েছে। ফাইনাল জেতার পর বিষয়টি সামনে আসে। এখন মাকে ফিরে পেয়ে সে অনেক খুশি। ওর মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা আছে। ঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে একদিন বাংলাদেশের নারী ফুটবলে বড় সম্পদ হয়ে উঠবে।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, নতুন কুড়ি স্পোর্টসে সাফল্যের জন্য আগামী ১৭ আগস্ট চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ ও বিভিন্ন ইভেন্টের বিজয়ীদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, ৬ আগস্ট পালিচড়া স্টেডিয়ামেও খেলোয়াড়দের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভাগের পক্ষ থেকেও ইতোমধ্যে খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন কুড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এর ফাইনালে কিসকু জোড়া গোল করে। পুরো টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা ছিল চারটি।


