সন্দেহজনক ২৫ মিলিয়ন ডলার অবরুদ্ধ করে যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিতে এগিয়ে এসেছিল চলতি বছরের শুরুতে। কিন্তু বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ অর্থটি হাতছাড়া হতে দিয়েছে।
সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিরা বুঝেশুনে এমন পথে হেঁটেছেন যাতে যুক্তরাজ্য থেকে টাকাটি নির্বিঘ্নে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া যায়, একই সাথে ওই অর্থের মালিক আইনীভাবেও রেহাই পান।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ), যুক্তরাজ্য ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ইউকেএফআইইউ) ও বিএফআইইউর গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নথি, ই-মেইল ও এনবিআরের কাগজপত্র বিশ্লেষণ এবং এন্টি-মানিলন্ডারিং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে এই তথ্য উঠে এসেছে।
অবরুদ্ধ অর্থটি ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও জাহাজভাঙা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর। ইউবিএস এজি ব্যাংকের লন্ডন শাখার হিসাবে থাকা এই অর্থ সাময়িকভাবে আটকে রেখে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউতে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল এনসিএ।
বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই অর্থ যুক্তরাজ্য ছেড়ে দেয় এবং মার্চের শুরুতে করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তরিত হয়। হাতছাড়া হয় ২০১২ সালে বিএফআইইউ প্রতিষ্ঠার পর বিদেশ থেকে অর্থ ফেরানোর প্রথম বাস্তব সুযোগ।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিগুলো বিএফআইইউর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক তিন কর্মকর্তা ও একজন আইনজীবী দিয়ে পৃথকভাবে পর্যালোচনা করিয়েছে টাইমস। তাদের প্রত্যেকের মূল্যায়ন প্রায় একই।
তারা বলেন, যুক্তরাজ্যের মেইলের বিপরীতে বাংলাদেশের দেওয়া জবাবগুলো ইঙ্গিত করে বিএফআইইউ সঠিক পথে এগোচ্ছিল না। দেশের স্বার্থে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করেন, যা শওকতকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়। অর্থ স্থানান্তরের পরই সক্রিয় হয় বিএফআইইউ। এরপর এমন পদক্ষেপ নিয়েছে যাতে শওকত খুব সহজেই পার পেতে পারেন।
‘কী ভয়াবহ ঘটনা! এমন কিছু ঘটতে পারে কখনো কল্পনাও করিনি। সত্যিই অবিশ্বাস্য,’ টাইমসের হাতে থাকা নথিগুলো দেখে বলেন বিএফআইইউ’র একজন সাবেক উপ-প্রধান।
মানি-লন্ডারিং আইন বিশেষজ্ঞ ব্যরিস্টার এম এম মশিউর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘শওকত আলীকে সুবিধা করে দিতে বুঝেশুনেই প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে বিএফআইইউ।’
‘কি পদক্ষেপ নিলে অর্থ আটকে রাখা যাবে তা বারবার স্পষ্ট করে দিচ্ছিল যুক্তরাজ্যের সংস্থাগুলো। কিন্তু যতদিন অর্থ অবরুদ্ধ ছিল ততদিন সচেতনভাবেই ওই পথ এড়িয়ে গেছে বিএফআইইউ,’ বলেন ওই আইনজীবী।
তবে অর্থ হাতছাড়া হওয়ার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এই গোয়েন্দা নথি কোথাও শেয়ার করতে যুক্তরাজ্য সুযোগ না দেওয়ায় আইনী পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। আমরা বারবার অনুমতি চাইলেও যুক্তরাজ্য অনুমতি দেয়নি।’
কিন্তু বিএফআইইউ প্রধানের এই দাবি মানতে নারাজ সংস্থাটির সাবেক উপ-প্রধান, যিনি নথিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘বিদেশি সংস্থাগুলো গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠালে সেগুলো অন্য কোন সংস্থার সাথে শেয়ার করতে নিষেধ করে থাকে। কিন্তু ওই তথ্যের ভিত্তিতেই দেশগুলো ব্যবস্থা নেয় ভিন্ন কৌশলে।’
‘কিন্তু এই কৌশল সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানেন না এমন নয়,’ বলেন ওই সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
ব্যরিস্টার এম এম মশিউর রহমান বলেন, ‘শওকতের হিসাব আবার অবরুদ্ধ করা হলে এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হতো এবং আনুষ্ঠানিক এমএলএ (আইনি সহায়তার অনুরোধ) পাঠানোর ভিত্তি তৈরি হতো।’
নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘জনস্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে বিএফআইইউ কেন এই অর্থ হাতছাড়া হতে দিল, তা অবশ্যই উদঘাটন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংস্থাটির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। তাই তারা দায় এড়াতে পারে না। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ ও যোগসাজশের ফল কি না।’
শওকত আলীর এই ঘটনা বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া কয়েকশ বিলিয়ন ডলার উদ্ধারের সম্ভাবনা ঝুঁকিতে ফেলেছে। সরকারি শ্বেতপত্রের হিসাবে, বিগত পনেরো বছরেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে যা দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সাত গুণ। এই অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব রয়েছে বিএফআইইউর নেতৃত্বাধীন স্টোলেন এসেট রিকভারি টাস্ক ফোর্সের ওপর।
কার সিদ্ধান্তে অর্থ হারাল বাংলাদেশ
টাইমসের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যপ্রমাণ বলছে, শওকতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন ও অপারেশন অ্যানালাইসিস উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক কামরুল হাসান আজাদ। তাদের নির্দেশনার আলোকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ই-মেইল চালাচালি করছিলেন পলিসি উইংয়ের উপপরিচালক ফুয়ারা খাতুন।
ওই অর্থের খবর দিয়ে যখন প্রথম মেইল আসে, শওকত আলী তখন বিএফআইইউর কাছে নতুন কেউ ছিলেন না। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি মেঘনা ব্যাংকের একটি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সংস্থাটি শওকত ও তার পরিবারের সদস্যদের লেনদেন খতিয়ে দেখে। ওই বছরের ১ জুলাই তার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করে দুই মাসের মাথায় ২৯ আগস্ট খুলে দেয়।
বিএফআইইউর ওই অনুসন্ধানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আজাদ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুসন্ধান শেষ হলেও নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদনটি সিআইডি বা দুদকে পাঠানোর প্রমাণ পায়নি টাইমস। ওই প্রতিবেদনে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে বিনিয়োগের মাধ্যমে শওকতের পাসপোর্ট অর্জন এবং সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল সম্পদের তথ্য নেই, যদিও অনুসন্ধানকালে এ-সংক্রান্ত নথি আজাদের হাতে পৌঁছানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পূর্বের এসব ঘটনায় শওকতের ক্ষেত্রে মামুন ও আজাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২৫ মিলিয়নের ঘটনায় শওকত আলীর কাছে থেকে তারা কোনো ধরনের সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে টাইমসে অনুসন্ধানে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের একটি প্যাটার্ন আবিস্কৃত হয়েছে।
তথ্য-প্রমাণ বলছে, বিএফআইইউ কখন কার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করছে সেই তথ্য সংস্থাটির প্রধানের ভাগনে শোয়ায়েব মো. মুনতাসির মোর্শেদের কাছে যাচ্ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবরোধ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক ‘প্যাকেজ’ প্রস্তাব করছেন।
এর স্বপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহের লক্ষ্যে এই প্রতিবেদকের অনুরোধে দুই ব্যবসায়ী শোয়ায়েবের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথোপকথন রেকর্ড করেন। রেকর্ডগুলো যাচাই করেছে টাইমস। এতে বিএফআইইউ প্রধান মামুনের রেফারেন্স দিয়ে অবরুদ্ধ ব্যাংক হিসাব খুলে দিতে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা অগ্রিম এবং অর্থ ছাড়ের পর হিসাবে থাকা অর্থের এক-চতুর্থাংশ চাইতে শোনা যায় শোয়ায়েবকে। অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পর বিএফআইইউ প্রধানের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তবে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ ছাড়া বৈঠক করাতে রাজি না হওয়ায় অনুসন্ধানের এই অংশটি আর এগোয়নি।
এ বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে বিএফআইইউ প্রধান মামুনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ চান। তবে সোর্সের নিরাপত্তার স্বার্থে অডিও রেকর্ড পাঠানো সম্ভব নয় জানালে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
বিএফআইইউ প্রধানকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানোর মিনিটখানেকের মধ্যেই তার ভাগিনা শোয়ায়েব এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। প্রথমে তিনি অভিযোগে অস্বীকার করলেও রেকর্ডের কথা জানালে ‘বিষয়টি সফটলি দেখার’ অনুরোধ জানান।
অবশ্য বিএফআইইউর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আর্থিক অনিয়মে জড়ানোর ঘটনা নতুন নয়। বর্তমান প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন দায়িত্বে এসেছেন আর্থিক ও নৈতিক স্খলনের দায়ে এ এফ এম শাহীনুল ইসলাম চাকুরিচ্যুত হওয়ার পর। এর আগের প্রধান মাসুদ বিশ্বাস আর্থিক অপরাধের অভিযোগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন।
২৫ মিলিয়ন নিয়ে কী ঘটেছিল
শওকত আলীর অবরুদ্ধ অর্থের বিষয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা বার্তা আসে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি। তার আগের দিন এনসিএ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিল। এতে লন্ডনের ব্যাংকে শওকতের নামে থাকা অর্থের বিষয়ে ঢাকাকে অবগত করে এনসিএ জানতে চায়, তিনি বাংলাদেশে কোনো চলমান অনুসন্ধানের বিষয় কি না এবং ঢাকা যুক্তরাজ্যের কাছে আরও সহায়তা চায় কি না।
এর আট দিন পর, ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ যুক্তরাজ্যকে জানায়, শওকত বাংলাদেশের ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’। তাই অর্থটি আটকে রাখার অনুরোধ জানানো হয়। জবাবে এনসিএ জানতে চায়, বিএফআইইউ কেন শওকতের ব্যাংক হিসাবের অবরোধ আর বাড়ায়নি এবং দেশে কেনো কোনো সম্পদ জব্দ করেনি।
‘বিদ্যমান আইনে আরও ৫ মাস ওই ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রাখতে পারত বিএফআইইউ। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রয়োজন হলে সিআইডি বা দুদকের মাধ্যমে আদালতে যাওয়ার পথও খোলা ছিল,’ বলেন ব্যরিস্টার এম এম মশিউর রহমান।
কিন্তু বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি এই পথে হাটেনি।
এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) জরুরি বার্তা পাঠায় ঢাকায়। লিখে, ‘সময় ফুরিয়ে আসছে।’ সতর্ক করে দিয়ে জানায়, বাংলাদেশ যে তথ্য পাঠিয়েছে, তা দিয়ে ওই অর্থ আরও সময় আটকে রাখা কঠিন হবে।
এই অর্থ আটকে রাখতে বাংলাদেশকে কী করতে হবে, বিএফআইইউকে তা আগেই জানিয়েছিল এনসিএ। শওকতের বিরুদ্ধে কে তদন্ত করছে, কী অপরাধের অভিযোগ, তদন্ত কতদূর এবং ২৫ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে সেই অপরাধের যোগসূত্র কোথায়–এসব জানতে চেয়েছিল সংস্থাটি। দুই মাসের মধ্যে কার্যকর পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ বা এমএলএ পাঠানো যাবে কি না, সেটিও জানতে চায়।
কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১:১৩ মিনিটে যে জবাব যায়, সেখানেই হারিয়ে যায় এই অর্থ ফিরিয়ে আনার সুযোগ।
যুক্তরাজ্যকে দেওয়া ওই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, দেশে শওকতের ব্যাংক হিসাব অবরোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। এনবিআর, সিআইডি ও দুদক তাকে নিয়ে পৃথকভাবে কাজ করলেও কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তার কোনো সম্পদ জব্দ করেনি।
দুই দিন পর, ২৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি-করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার এ ঘটনায় আর এগোবে না। তবে পরবর্তীতে অভিযোগ দাঁড় করাতে পারলে আবার যোগাযোগ করতে বলা হয়।
ব্যাংকিং ও গোয়েন্দা নথি বলছে, ওই মেইলের পরপরই লন্ডন শওকত আলীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি খুলে দেয়।
অর্থ হাতছাড়া হওয়ার পর সক্রিয় বিএফআইইউ
নথিপত্র বলছে, শওকতের অর্থ দুবাইয়ে স্থানান্তরিত হওয়ার পরই যুক্তরাজ্যের দেখানো পথে হাঁটা শুরু করে বিএফআইইউ।
১০ মার্চ সংস্থাটি যুক্তরাজ্যকে জানায়, অফশোর শেল কোম্পানির মাধ্যমে কথিত বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের ঘটনায় শওকতের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
বিএফআইইউ আবারও অর্থের ওপর অবরোধের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানায়, কিন্তু কোনো জবাব পায়নি। ১৫ মার্চ এনবিআর শওকতের বিরুদ্ধে ৩০৭ কোটি টাকার করদাবি ও জরিমানা আরোপ করে, যা তৎকালীন বিনিময় হারে ২৫ মিলিয়ন ডলারের সমান।
১৭ মার্চ বিএফআইইউ ওই জরিমানা এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের তদন্তকে অর্থটির ওপর বাংলাদেশের দাবি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাজ্যের সামনে তুলে ধরে। একই সঙ্গে অর্থটি আটকে রেখে বাংলাদেশে ফেরাতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব প্রচেষ্টার কোনো ফল মেলেনি।
গোপন নথি যায় এনবিআরে
কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকার অজুহাতে সিআইডি, দুদক বা আদালতে তথ্য উপস্থাপন না করা হলেও এগুলো এনবিআরে যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে বৈপরীত্যে ভরা ব্যখ্যা দিয়েছিলেন বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মামুন।
১৩ জুলাই তিনি টাইমসকে বলেন, এই ফাইল তিনি নিজে এনবিআরে গিয়ে দিয়ে এসেছেন।
তার বক্তব্যের সূত্র ধরে টাইমস এনবিআর থেকে এনসিএ, ইউকেএফআইইউ ও বিএফআইইউর মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া ই-মেইলের কপি উদ্ধার করে।
কিন্তু ৩ আগস্ট নিজের বক্তব্য বদলান বিএফআইইউ প্রধান। তিনি এনবিআরে ওই নথি পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এনবিআরকে নথি দেওয়া হলেও সিআইডি ও দুদকের সঙ্গে কেন তথ্য শেয়ার করা হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এনবিআরের নথি বিশ্লেষণ করে ব্যরিস্টার এম এম মশিউর রহমান বলেন, ‘যে প্রক্রিয়ায় এনবিআর শওকতকে জরিমানা করেছে সেটি তার পক্ষে গেছে। যেই ধাপগুলো অনুসরণ করে করদাবি ও জরিমানা আরোপ করতে হয় সেই প্রক্রিয়া এখানে অনুসরণ করা হয়নি। এতে আপিলে গিয়ে সুবিধা পাবেন শওকত আলী।’
দেশে অর্থ ফেরানোর এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার কারণ জানতে চাইলে বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন টাইমসকে বলেন, ‘এই অর্থ আমরা হারাইনি। সমপরিমাণ অর্থ এনবিআর জরিমানা করায় নিরাপদ হয়েছে। অর্থ যদি ফিরে নাও আসে, জরিমানার অর্থ আদায়ের মাধ্যমে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ হয়েছে।’
তবে মশিউর রহমান মনে করেন, ‘এই অর্থে রাষ্ট্রের অধিকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুব কম, যদি শওকত আলী নিজে থেকে এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে না আনেন।’


