সংবাদমাধ্যমে মালিকদের প্রভাব কমাতে তাদের একটি সীমা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। এতে মালিকের পাশাপাশি সম্পাদকের জন্যও পৃথক আচরণবিধি তৈরি করা হবে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে রোববার রাজধানীতে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত আলোচনায় এ কথা জানানো হয়।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘একজন হাসপাতালের মালিক যেমন সার্জনকে বলতে পারেন না কীভাবে অপারেশন করতে হবে–তাহলে রোগী মারা যাবে। ঠিক তেমনি মিডিয়ার মালিক মিডিয়া পরিচালনা করতে পারেন না, শুধু সম্পাদকই পারেন।’
আলোচনায় বক্তারা মূলধারার গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটের জন্য শুধু সামাজিক মাধ্যমকে নয়, সংবাদমাধ্যমের নিজেদের ব্যর্থতাকেও সমানভাবে দায়ী করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ‘সংসদে প্রকাশিত টাকা পাচারকারী ও খেলাপিদের তালিকা কোনো কোনো পত্রিকায় হয় পুরোপুরি চাপা দেওয়া হয়েছে, নয়তো মালিকের নিজের নাম বাদ দিয়ে ছাপা হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান নিজের মালিকের নাম বাদ দিয়ে তালিকা ছাপে, সে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করবে কীভাবে?’
সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার গত ৭ জানুয়ারির আদেশকে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান ভুল রিপোর্ট করলে শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সব সাংবাদিককে শাস্তি দেওয়া কোনো নীতিমালায় সমর্থিত নয়।’
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নুরুল কবির বলেন, ‘প্রতিটি দলই ক্ষমতায় গেলে বলে ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা কর’, বাইরে থাকলে বলে তোমরা হাত খুলে লেখো।’
সরকারকে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের কোনগুলো আপনারা বাস্তবায়নে প্রস্তুত? আমাদের সঙ্গে বসার আগেই সেটা জানান।’
২০২৪-এর অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের রক্তের প্রতি সম্মান রেখেই সরকার ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে পথ চলতে হবে।’
নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সত্য সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে… সারা দুনিয়ায় সত্য মরে গেছে।’
ভুয়া তথ্যকে ‘মহামারী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি মোকাবিলায় শুধু আইন নয়, সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।’
ইউটিউব ও ফেসবুক লাইভের প্রতিযোগিতার কারণে ভুয়া খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এক ঘণ্টা পরে হয়তো জানা যাচ্ছে সেটা মিথ্যা, কিন্তু ততক্ষণে মানুষ বিশ্বাস করে ফেলেছে।’
প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবনতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই অবনতি শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের নয়, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দমন-পীড়নের ফল।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় চরিত্র হনন, নারী-বিদ্বেষী প্রচারণা ও সাইবার অপরাধের ব্যাপকতাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করে তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন
আলোচনায় নুরুল কবির, মতিউর রহমান চৌধুরী, হাসান হাফিজ ও কামাল আহমেদ একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে দেনদরবার করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাংলাদেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। অথচ অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক আইন করেছে।
পরে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করে একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে চায়।’ এই কমিশনের আওতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও আনার পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
নুরুল কবির জানান, ‘কমিশন করব’, এমন প্রতিশ্রুতি তারা আর শুনতে চান না, চান বাস্তব পদক্ষেপ।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। এটা থেকে বের হতে হলে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। কারণ, এখন প্রত্যেকের বাড়িতেই একজন ‘সাংবাদিক’, সে যা দেখছে তাই প্রচার করছে।’
সরকারি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত সরকারি কাঠামো অনেকটা বাটন ফোনের মতো, অথচ সমস্যাটা স্মার্টফোন যুগের।’

