শীত আসার আগেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের কম্বল পল্লী। গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি কম্বল এখন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কম দাম ও ভালো মানের কারণে এসব কম্বলের চাহিদা রয়েছে সারাদেশে। এবার শীত মৌসুমে প্রায় দেড়শ কোটি টাকার কম্বল বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রায় তিন দশক আগে যমুনার ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকার পথ হিসেবে কাজীপুরে ঝুট কাপড় দিয়ে কম্বল তৈরির কাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা একটি বড় শিল্পে রূপ নেয়।
কাজীপুরের শিমুলদাইড়, বড়শীভাঙ্গা, সাতকয়া, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া ও পাইকরতলীসহ প্রায় ৩৫টি গ্রামে কম্বল তৈরি হয়। কাজীপুর সদরসহ চার ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামে রয়েছে ছোট-বড় কারখানা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এসব কারখানায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
কারখানাগুলোতে চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। কেউ ঝুট কাপড় কাটছেন, কেউ টুকরো কাপড় জোড়া লাগাচ্ছেন। কোথাও চলছে সেলাই ও নকশার কাজ, আবার কোথাও কম্বল শুকানো হচ্ছে। শীতের চাহিদা সামনে রেখে দিন-রাত কাজ করছেন কারিগররা।
শিমুলদাইড় গ্রামের কারিগর বেলি খাতুন বলেন, গার্মেন্টস থেকে সংগ্রহ করা ছোট ছোট কাপড়ের টুকরা দিয়ে তারা কম্বল তৈরি করেন। প্রতিটি কম্বল তৈরিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পারিশ্রমিক পান। বাড়ির কাজ সামলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি কম্বল তৈরি করতে পারেন।
মেসার্স সহী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শরীফুল ইসলাম সোহেল বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে কাঁচামাল এনে কাটিং করে কম্বল তৈরি করা হয়। দেশের প্রায় ৪০টি জেলার ব্যবসায়ীরা কাজীপুরে এসে কম্বল কিনে নিয়ে যান। কম দাম ও ভালো মানের কারণে এসব কম্বলের চাহিদা রয়েছে। শিল্পের প্রসারে ব্যাংক স্থাপন ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান বলেন, আগে মূলত ঝুট কাপড় দিয়ে কম্বল তৈরি হলেও এখন ফ্রেশ কাপড় দিয়েও কম্বল তৈরি হচ্ছে। ২০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের কম্বল পাওয়া যায়। উত্তরাঞ্চলে শীত বেশি হওয়ায় সেখানে কাজীপুরের কম্বলের চাহিদা বেশি।
ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, নদীভাঙনে বাড়িঘর হারানোর পর জীবিকার তাগিদে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে কাপড়ের টুকরা এনে কাজীপুরে কম্বল তৈরির কাজ শুরু করেন। সাধারণত একটি কম্বল চার থেকে পাঁচ হাত হয়। এগুলো ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।
এখন কাজীপুরের কম্বল শুধু স্থানীয় বা পাইকারি বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইনেও সারাদেশে পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে পরিচালিত ‘কাজীপুর কম্বল বাজার’ প্ল্যাটফর্ম থেকে ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার পার্সেল পাঠানো হয়েছে। এবার অনলাইনে দুই থেকে তিন কোটি টাকার কম্বল বিক্রির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাজী আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রতি মৌসুমে কাজীপুরের কম্বল শিল্পে বিপুল অর্থের লেনদেন হয়। এ শিল্পে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আর্থিক লেনদেন সহজ করতে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কাজীপুরের কম্বল শিল্পে প্রায় ৫০০ ব্যবসায়ী যুক্ত। বাংলা, বিশ্বাস ও চায়নাসহ প্রায় ১৬০ ধরনের কম্বল বাজারে পাওয়া যায়। দাম ৯০ টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন এই অঞ্চলে অর্ধকোটি থেকে এক কোটি টাকার কম্বল বেচাকেনা হয়।
কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহানাজ পারভীন বলেন, কম্বল শিল্পের সঙ্গে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িত। শীত মৌসুম সামনে রেখে কারিগর ও ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। শিল্পটির প্রসার হলে স্থানীয়ভাবে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। মানসম্মত কম্বল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সহায়তা, ব্যাংকিং সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে কাজীপুরের কম্বল শিল্প আরও বড় পরিসরে গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হওয়ার পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।


