শি জিনপিংয়ের ‘বন্ধু হতে পেরে গর্বিত’ ট্রাম্প

শি জিনপিংয়ের ‘বন্ধু হতে পেরে গর্বিত’ ট্রাম্প
বেইজিং সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘মহান নেতা’ ও ‘বন্ধু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দুই নেতার মধ্যে শুরু হওয়া দুই দিনের বৈঠকের শুরুতেই ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। বৈঠকে মূলত ওয়াশিংটন-বেইজিং ভঙ্গুর বাণিজ্য, শুল্ক যুদ্ধে বিরতি, ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আড়ম্বরপূর্ণ এ শীর্ষ বৈঠকের সূচনা হয় বেইজিংয়ের বিশাল গ্রেট হল অব দ্য পিপলে। সেখানে লাল গালিচায় ট্রাম্পকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। দুই নেতা এ সময় হাসিমুখে করমর্দন করেন।

চীনা সেনারা বিপ্লবী সংগীতের তালে কুচকাওয়াজ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা হাতে স্কুলশিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। দুই নেতা পাশাপাশি হাঁটার সময় ট্রাম্পকে কয়েকবার শি জিনপিংয়ের পিঠে হাত রাখতেও দেখা যায়।

চীনের সেনাদের কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি

নিজ নিজ প্রতিনিধিদল নিয়ে মুখোমুখি বৈঠকে ট্রাম্প শি জিনপিংকে বলেন, ‘আপনি একজন মহান নেতা। অনেকে হয়তো আমার এই কথা পছন্দ করেন না, কিন্তু আমি তবুও বলি।’

‘অনেকে বলছেন, এটি হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শীর্ষ বৈঠক। আপনার সঙ্গে থাকতে পেরে আমি সম্মানিত। আপনার বন্ধু হতে পেরে আমি গর্বিত। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হবে’, যোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

জবাবে শি জিনপিং বলেন, ‘এক দেশের সাফল্য অন্য দেশের জন্যও সুযোগ তৈরি করে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক পুরো বিশ্বের জন্য উপকারী। আমরা সহযোগিতা করলে উভয় পক্ষ লাভবান হয়, আর মুখোমুখি সংঘাতে গেলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

মুখোমুখি বৈঠকে ট্রাম্প ও শি। ছবি: এপি/ইউএনবি

বেইজিং সফর শুরুর আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, শি জিনপিংয়ের কাছে তার প্রথম অনুরোধ হবে চীনের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতের জন্য আরও উন্মুক্ত করা। দুই পক্ষ এবার পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সংলাপ নিয়েও আলোচনা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরটি তার জন্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৭ সালের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর। সেবারও ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সবশেষ চীন সফর করেছিলেন।

এবারের সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে আছেন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের মতো কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী। তারা ট্রাম্প-শি বৈঠকের সাইডলাইনে চীনের সঙ্গে নানা বাণিজ্যিক জটিলতার সমাধান করতে চান।

আরও পড়ুন

দুই দেশের পতাকা হাতে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান চীনের স্কুল শিক্ষার্থীরা। ছবি: এপি/ইউএনবি

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে একান্ত আলোচনার সুযোগ থাকবে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর তারা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করবেন এবং রাতে রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেবেন। শুক্রবার তারা একসঙ্গে চা পান ও মধ্যাহ্নভোজ করবেন।

ট্রাম্পের ২০১৭ সালের চীন সফরের পর দুই দেশের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলি ওয়াইনের ভাষায়, আগের সফরে চীন নিজেদের ক্রমবর্ধমান শক্তির অবস্থান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে সচেতন করতে চেয়েছিল এবং ট্রাম্পকে বিশেষ সম্মান দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কিনলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

আলি ওয়াইন বলেন, ‘এবার যুক্তরাষ্ট্রই স্বতঃস্ফূর্তভাবে চীনের অবস্থানকে স্বীকার করছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বৈঠকে ট্রাম্পকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলো চীনসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপে ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিপরীতে চীনের অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হলেও শি জিনপিং ট্রাম্পের মতো কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে নেই।

তারপরও দুই দেশই গত অক্টোবরে হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে আগ্রহী। ওই সমঝোতায় ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত করেন। একইভাবে শি জিনপিং বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে অস্ত্র তৈরিতে বিরল খনিজ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

বৈঠক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং উড়োজাহাজ, কৃষিপণ্য ও জ্বালানি রপ্তানি বাড়াতে চায়। অন্যদিকে বেইজিং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি ও উন্নত অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি তুলবে বলে জানা গেছে।

বাণিজ্যের বাইরে ট্রাম্প চীনের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন, যেন তারা তেহরানকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চাপ দেয় এবং সংঘাত অবসানে ভূমিকা রাখে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে দেখায় শি জিনপিং তেহরানের ওপর খুব বেশি চাপ প্রয়োগে আগ্রহী হবেন না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। ছবি: এপি/ইউএনবি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফক্স নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখা চীনের নিজের স্বার্থেও প্রয়োজন। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বহু জাহাজ আটকে আছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি কমে গেলে চীনা রপ্তানিকারকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হচ্ছে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি। দ্বীপটি গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে।

তাইওয়ানের শীর্ষ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাকাডেমিয়া সিনিকার সহকারী গবেষক রোনান ফু বলেন, ‘ট্রাম্পের হাতে আসলে খুব বেশি শক্তিশালী তাস নেই। তবে আমার মনে হয় না ট্রাম্প নিজেও বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে আছেন।’

‘আমি মনে করি না ট্রাম্প এমন অবস্থানে যাবেন, যেখানে বেইজিং যা চাইবে, যুক্তরাষ্ট্র তাই মেনে নেবে’, যোগ করেন তিনি।

চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও পাল্টা যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নেওয়ার পর এটি হবে শি জিনপিংয়ের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad