গাজীপুর বিআরটি পরিণত হয়েছে ‘সাদা হাতিতে’

গাজীপুর বিআরটি পরিণত হয়েছে ‘সাদা হাতিতে’
ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চৌদ্দ বছরের বেশি সময় এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থার কোনো গন্তব্য নেই, তার বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পরিশোধ করছে।

ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার করিডরটিকে একসময় যানজটমুক্ত, সিগন্যালমুক্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

এক দশকেরও বেশি সময় পরেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সমালোচকদের ভাষায়, এটি দুর্বল পরিকল্পনা ও ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়নের একটি ক্লাসিক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে, তবু একটি বিআরটি বাসও এখনো সেবায় নামেনি। এদিকে দুই বছর আগের গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার পর স্টেশনগুলোর এসকেলেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম মরিচা ধরতে শুরু করেছে। যা অবশিষ্ট আছে তা হলো হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা, যা আগামী দুই দশকে পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পগুলো প্রায়ই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত সংযোগ ও সহজ জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন যত এগোয়, সংশোধনী জমতে থাকে, সময়সীমা বাড়ে, ব্যয় বাড়ে এবং বিদেশি ঋণ জমা হয়।

গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পও একই পথ অনুসরণ করেছে। প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রেজাউল করিম প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট চিত্র দিতে পারেননি। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘একনেকে সর্বশেষ আলোচনায় বলা হয়েছিল, প্রকল্পটি যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। তবে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।’

ব্যয় বাড়ে, সময়সীমা দীর্ঘ হয়

২০১২ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা, আর সমাপ্তির সময়সীমা ছিল ২০১৬ সাল। এরপর সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যয় তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা হয়।

২০২৫ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ চতুর্থ সংশোধনের প্রস্তাব দেয়, যেখানে আরও ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা যোগ করে সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়। সংশোধিত ব্যয় দাঁড়াত ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।

অব্যবহৃত ঋণ, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অব্যবহৃত রয়েছে। ৩ হাজার ২২ কোটি টাকার বিদেশি সহায়তার মধ্যে ২ হাজার ৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, আর প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা অব্যবহৃত।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ১০ কোটি ডলারের সাধারণ মূলধন সম্পদ (ওসিআর) ঋণ এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার (এএফডি) ৪৫ মিলিয়ন ইউরো ঋণ সম্পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এডিবির আরেকটি ৬ কোটি ডলারের সহজ শর্তের ঋণের ৯৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার ব্যবহৃত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এডিবির অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলারের সাধারণ ঋণ নিয়ে। বাংলাদেশ এর মধ্যে ৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার নিয়েছে, তবে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যবহার না করলে বাকি অর্থ বাতিল হতে পারে। অব্যবহৃত এডিবি সাধারণ ঋণের ওপর সরকারকে বার্ষিক শূন্য ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জও দিতে হবে।

করদাতার অর্থে অর্থায়িত এই প্রকল্প যাত্রীদের সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস কেনা ও পরিচালনার জন্য ৬২ মিলিয়ন ইউরোর এএফডি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু কোনো বাস কেনা হয়নি, তাই সেই অর্থের কোনো অংশই ব্যবহার হয়নি।

পুরোনো এডিবি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রকল্প নিষ্ক্রিয় থাকা সত্ত্বেও সরকার এখন জাতীয় বাজেট থেকে মূলধন ও সুদ পরিশোধ করছে।

আরও পড়ুন

বিতরণ করা প্রায় ২৪৯ মিলিয়ন ডলারের ঋণের বেশিরভাগই এখনো অপরিশোধিত। প্রকল্প চালু না হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে।দেশটি বার্ষিক ৭ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলার সুদও দিচ্ছে। এডিবির অতিরিক্ত ৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার ঋণের মূলধন পরিশোধ শুরু হবে ২০২৭ সালের শেষে।

বাস ছাড়া বিআরটি

একটি বিআরটি ব্যবস্থা বিশেষায়িত বাসকে ঘিরে গড়ে ওঠে। অথচ সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, বাংলাদেশ ১৪ বছরে একটি বাসও কেনেনি।

২০১৭ সালে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসক্যাপ) সুপারিশ অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনা ছিল স্বয়ংক্রিয় দরজাসহ ১৮ মিটার লম্বা আর্টিকুলেটেড বাস চালানোর। পরিকল্পনাটি পরে বাদ দেওয়া হয়।

এরপর সরকার বৈদ্যুতিক বাসের দিকে এগোয় এবং একটি দরপত্র ডাকে, কিন্তু পরে তা প্রত্যাহার করে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি ডিজেলচালিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনার জন্য আরেকটি দরপত্র ডাকা হয়। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

৯৪ দশমিক ৮২ শতাংশ অগ্রগতি, অব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো

এডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ৯৪ দশমিক ৮২ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি অর্জন করেছে। ব্যয়ের বেশিরভাগ গেছে সড়ক প্রশস্তকরণ, ফ্লাইওভার, টঙ্গী সেতু, স্টেশন ও ডিপো নির্মাণে। তবু অবকাঠামো অনেকাংশে অব্যবহারযোগ্য।

করিডর বরাবর নির্মিত ১৫টি স্টেশনের একটিও চালু হয়নি। উত্তরায় একটি স্টেশনে স্থাপিত এসকেলেটরটি এখন অচল, আর লিফট ও এসকেলেটর অবহেলায় ক্ষয়ে যাচ্ছে। ২০ কিলোমিটার রুটের কয়েকটি স্থানে বিআরটি লেন আলাদা করা কংক্রিটের বাধা ও লোহার বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা নকশার ত্রুটিকে প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। স্টেশনের কাছে সড়ক সরু হয়ে যায়, আর ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি পায়ের ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে। আব্দুল্লাহপুর, ভোগড়া ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের নকশা ভবিষ্যৎ পরিবহন বিকল্প সীমিত করে ফেলেছে।

এছাড়া পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়া এবং নকশা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কাজ শুরু হয়েছিল। ইউটিলিটি স্থানান্তরে দুর্বল সমন্বয় এবং অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনের কারণে সারা বছর জলাবদ্ধতা ও যানজট তৈরি হচ্ছে।

অনেক সংস্থা, সমন্বয় সামান্য

প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনটি সরকারি সংস্থা জড়িত ছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ১৬ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ, বিআরটি লেন, ছয়টি ছোট ফ্লাইওভার ও ২৫টি স্টেশনের দায়িত্বে ছিল। সেতু বিভাগ সাড়ে চার কিলোমিটারের ফ্লাইওভার ও ১০ লেনের টঙ্গী সেতু দেখেছে।

এলজিইডি সার্ভিস লেন, গাজীপুর ডিপো, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ও সড়কবাতির দায়িত্বে ছিল। চারটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ তদারকি করেছে, আর সমন্বয় সামলেছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটির একটি কমিটি।

বাস পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে আলাদা একটি কোম্পানি, ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিবিআরটিসিএল) গঠন করা হয়। কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই অন্য সরকারি দপ্তর থেকে নেওয়া। কিন্তু বাস না থাকায় ১৩ বছর ধরে কোম্পানিটির কার্যত কোনো কাজ নেই। এখন এটি প্রস্তাবিত বাসনেট কোম্পানির দায়িত্ব চাইছে।

তবে ডিবিআরটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন খান টাইমসকে বলেন, ‘প্রকল্পটি চালু হবে, বাতিল হবে নাকি অন্য রূপে এগিয়ে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।’

উত্তরণের পথ খোঁজা হচ্ছে

একনেক চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর কর্তৃপক্ষ বিকল্প খোঁজা এবং নকশার ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা শুরু করে।

২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। ৯ অক্টোবর তৎকালীন সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হককে কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রেজাউল করিম বলেন, একনেকে মূল প্রশ্ন ছিল প্রকল্পটি যথাযথভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না।

প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের অধীনে ১৫ জুন বিআরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিনিয়োগ ও জনদুর্ভোগ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

টেবিলে চারটি বিকল্প

পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান টাইমসকে বলেন, এখন চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রথম বিকল্প হলো প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাতিল করা, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম ও লেন বিভাজকের মতো বিদ্যমান অবকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং সড়কটিকে আগের ৩+৩ লেন মহাসড়ক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা।

তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের যুক্তি, মাত্র ৩ শতাংশ অবকাঠামো কাজ বাকি থাকতে প্রকল্প পরিত্যাগ করা অবাস্তব। স্টেশন, র্যাম্প ও এসকেলেটর অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

দ্বিতীয় বিকল্প হলো বিআরটি করিডরকে টোলভিত্তিক এক্সপ্রেস লেনে রূপান্তর করা। তৃতীয় বিকল্প হলো বিদ্যমান বিআরটি পরিকল্পনা সম্পন্ন করা। চতুর্থ বিকল্প হলো মিশ্র লেন ও বিআরটি করিডর উভয়েই চলতে পারে এমনভাবে বিদ্যমান বাস পরিবর্তন করে একটি সমন্বিত গণপরিবহন করিডর তৈরি করা। হাদিউজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী মূলত শেষ দুই বিকল্পের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad