জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নয় লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরই মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
যার মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের বর্তমান বাস্তবায়ন সক্ষমতার তুলনায় এসব লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা হলো ঘাটতি। আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ২১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘাটতি অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কল্যাণমূলক ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ঘাটতি- সব মিলিয়ে বাজেটটি স্পষ্ট বৈপরীত্যের চিত্র তুলে ধরছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য ৪ দশমিক ১৪ শতাংশের তুলনায় ঢের বেশি।
মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের বেশি থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি ব্যয় দ্রুত কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ দেশের বিনিয়োগ খাতের পরিস্থিতি এখনো নাজুক।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং প্রকৃত বেসরকারি বিনিয়োগ গত ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো হ্রাস পেয়েছে। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিনিয়োগ প্রবাহ এখনো টালমাটাল।
আগামী অর্থবছরে মোট সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।

এ ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটের (দুই লাখ কোটি টাকা) তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
অনুন্নয়ন কর্মসূচির বাইরের ব্যয়সহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
তবে বাস্তবতা বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় অর্ধেক অর্থও যথাযথভাবে ব্যয় করতে পারেনি।
রাজস্ব আহরণকে বাজেটের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। আগামী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ১৮ শতাংশের সমান।
এ লক্ষ্যমাত্রা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিকল্পনার তুলনায় প্রায় ২০ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করলেও কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি বছরের সম্ভাব্য ঘাটতি বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি ৪০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের মতে, বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এ ধরনের অনুমান বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। তিনি বলেন, ‘রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার এবং বিনিয়োগকারী ও করদাতাদের জন্য সেবার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ছাড়া এসব লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।’
বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করেছে।
নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমিয়ে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক ঋণ ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ নয় হাজার ৮৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক অনুদান ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ছয় হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় সরকার অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্য এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৯৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, আগামী অর্থবছরেও বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আবারও ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়বে। এতে তারল্য সংকট তীব্র হতে পারে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এদিকে ব্যয় বাড়ানো হলেও বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশে সীমিত রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। টাকার অঙ্কে এ ঘাটতি দুই লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমেই আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত করছে। রাজস্ব ব্যয় মেটাতেও সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। শুধু সুদ পরিশোধেই আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা।
পরিচালন ব্যয় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকায়, ফলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা আরও কমে যাবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি আংশিক বাস্তবায়নের প্রভাবও পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য মোট এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, কৃষিখাতে সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাসে ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং খাদ্যে নয় হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
কৃষি প্রণোদনা ১৭ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি প্রণোদনা সাত হাজার ৮২৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রবাসী আয় প্রণোদনা ছয় হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বাজেট কাঠামোতে সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কৃষি খাতে ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। ধীরে ধীরে খোলা বাজারে বিক্রি, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিবর্তে পরিবার কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করা হবে।
কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবহন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, সৃজনশীল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি, নীল অর্থনীতি এবং ক্রীড়া অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশের সমান। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর ফলে জিডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের অংশ ১ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হবে।
সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সম্মিলিত বরাদ্দ ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা করা হবে।
পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাদানকারীদের জন্য সম্মানীভাতা কর্মসূচির পাশাপাশি বিদ্যমান নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিগুলোও সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে পরিবার কার্ড ব্যবস্থাই খোলা বাজারে বিক্রি, টিসিবির বিক্রয় কার্যক্রম এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিকল্প হয়ে উঠবে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে উচ্চাভিলাষ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সরকারগুলো নিয়মিত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু বাস্তবায়ন সমস্যার কারণে পরে সেগুলো কমিয়ে আনতে হয়।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্রমশ সংকুচিত আর্থিক পরিসরের মধ্যে করদাতাদের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি।


